টাকা-পয়সার হিসাব ছেড়ে বিশ্বকাপের ভবিষ্যদ্বাণী দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

মূল্যস্ফীতি, সুদের হার কিংবা বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিল সব গাণিতিক সমীকরণ নিয়ে সাধারণত দিনরাত ব্যস্ত থাকেন বিশ্বের নামী-দামি অর্থনীতিবিদেরা। তবে চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই তাঁদের চেনা টেবিলের দৃশ্যপট বদলে যায়। নিজেদের পেশাগত টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশ একপাশে সরিয়ে রেখে তাঁরা মেতে ওঠেন অন্য এক ফুটবলীয় হিসাবে, কার হাতে উঠছে এবারের বিশ্বসেরার ট্রফি?

আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের ওপর বিশেষ এই জরিপ পরিচালনা করেছে। প্রথাগত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেওয়ার অভ্যাস ভুলে এই প্রথম তাঁরা দল বেঁধে ফুটবল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী দিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সমস্ত গাণিতিক মডেলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবার চ্যাম্পিয়ন হবে ফ্রান্স। তাঁদের অনুমান অনুযায়ী, আগামী ২০ জুলাইয়ের ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন ফরাসিরা।

জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ অর্থনীতিবিদ তাদের পেশাগত অনুমান ক্ষমতা ব্যবহার করে ফ্রান্সকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন বেছে নিয়েছেন। আর ৩১ শতাংশের ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে স্পেন। এই অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয়, তবে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল কীর্তি গড়বেন, ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড হবে তাঁর।

লন্ডনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আরবিসির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি টাকা-পয়সার জটিল থিওরি বাদ দিয়ে ফুটবলের শক্তিমত্তা বিশ্লেষণ করে জানান, কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল হারার পর ফরাসিরা এখন আরও শক্তিশালী। তাঁর মতে, নতুন ও অভিজ্ঞদের দুর্দান্ত ভারসাম্যের পাশাপাশি কিলিয়ান এমবাপ্পের বর্তমান ফর্মই ফ্রান্সকে ট্রফি জেতানোর জন্য যথেষ্ট। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এমবাপ্পে এবার গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট, দুটিই নিজের পকেটে পুরবেন।

তবে অর্থনীতির এই বোদ্ধারা শুধু সাফল্যের গল্পই শোনাননি, শুনিয়েছেন চরম হতাশার পূর্বাভাসও। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদ অনুমান করছেন, কার্লো আনচেলত্তির মতো হেভিওয়েট কোচ থাকা সত্ত্বেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কপালে এবার ঘোরতর বিপর্যয় রয়েছে। ব্রাজিলের এই সম্ভাব্য ভরাডুবির পর হতাশার তালিকায় তাঁরা রেখেছেন ইংল্যান্ড ও জার্মানিকে।

মজার ব্যাপার হলো, অর্থনীতিবিদেরা সব সময় কঠোর ডেটা ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কথা বললেও, বিশ্বকাপের বেলায় তাঁরাও আবেগের কাছে হেরে গেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৮ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অকপটে স্বীকার করেছেন, তাঁরা কোনো গাণিতিক মডেল নয়, বরং স্রেফ নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে জাপান, মেক্সিকো কিংবা মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন। আর ৭৩ শতাংশ অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো কঠিন ডেটা বিশ্লেষণ না করে নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও মনস্তাত্ত্বিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন। মাত্র ২০ শতাংশ অর্থনীতিবিদ কঠোর ডেটা ও গাণিতিক মডেলের সাহায্য নিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের এই প্যানেল মনে করছে, আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে এবার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ‘ডার্ক হর্স’ বা চমক হতে পারে। উদীয়মান তারকাদের মধ্যে তাঁদের বাজি স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল।

অবশ্য দিনশেষে অর্থনীতিবিদেরা ভালো করেই জানেন, কাগজের হিসাব আর মাঠের জাদুর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। ফুটবলের সবুজ মাঠে পরিসংখ্যান কিংবা অর্থনৈতিক সমীকরণগুলো অনেক সময়ই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তবে মাঠের আসল লড়াই শুরুর আগে, টাকা-পয়সার হিসাব ভুলে দেওয়া অর্থনীতিবিদদের এই ভবিষ্যদ্বাণী ফরাসি সমর্থকদের মনে যে বড় রকমের দোলা দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

এএন