বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বসেরাদের লড়াই, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো মুহূর্ত পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। সেই কারণে লাল কার্ড সব সময়ই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয়। মজার ব্যাপার হলো, ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড দেখার রেকর্ড যে দলের, সেই ব্রাজিলই আবার সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জেতা দেশ।
ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা মোট ১১টি লাল কার্ড দেখেছেন। এই তালিকায় তাদের পরেই রয়েছে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে, দুই দলেরই লাল কার্ড ১০টি করে। ক্যামেরুন পেয়েছে ৯টি লাল কার্ড। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও জার্মানি- প্রতিটি দলের খেলোয়াড়রা ৮টি করে লাল কার্ড দেখেছেন।
ব্রাজিলের এই ১১টি লাল কার্ড এসেছে মোট ৯টি ভিন্ন ম্যাচে। কয়েকটি ম্যাচে একই সঙ্গে দুই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আবার কয়েকজন ফুটবলার একাধিকবারও বহিষ্কৃত হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাটল অব বোর্দো’ নামে পরিচিত ম্যাচে ব্রাজিলের জেজে প্রোকোপিও ও মাশাদো দুজনই বহিষ্কৃত হন। একই ম্যাচে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়ও লাল কার্ড দেখেছিলেন।
এরপর ১৯৫৪ সালের ‘ব্যাটল অব বার্ন’ হিসেবে পরিচিত কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ব্রাজিলের হাম্বার্তো ও নিলতন সান্তোস লাল কার্ড দেখেন। ওই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ ও সংঘর্ষপূর্ণ লড়াই হিসেবে এখনও স্মরণ করা হয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ব্রাজিলের জোজিমার বহিষ্কৃত হন। ১৯৯০ সালের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখেন মিডফিল্ডার মাউরো সিলভা। সেই ম্যাচে ক্লদিও কানিজিয়ার একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা জয় পেয়ে ব্রাজিলকে বিদায় করে।
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর ম্যাচে লিওনার্দো কনুই দিয়ে ট্যাব রামোসকে আঘাত করায় সরাসরি লাল কার্ড পান। বিশ্বকাপের অন্যতম বিতর্কিত বহিষ্কারের ঘটনা হিসেবে এটি এখনও আলোচিত।
২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদিনিয়ো ড্যানি মিলসকে বিপজ্জনক ট্যাকল করায় লাল কার্ড দেখেন। যদিও ১০ জনের দল নিয়েও ব্রাজিল ২-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে উঠে যায়।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে কাকা দুই হলুদ কার্ডের ফলে মাঠ ছাড়েন। ম্যাচের শেষ দিকে আইভরি কোস্টের আবদেল কাদের কেইতার সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় তিনি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন। অনেকেই সেই সিদ্ধান্তকে বিতর্কিত বলে মনে করেন।
একই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফেলিপে মেলো আরিয়েন রোবেনকে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ওই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল।
তবে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ডের রেকর্ড দেখেই ব্রাজিলকে সবচেয়ে রুক্ষ দল মনে করার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে একমাত্র ব্রাজিল। ১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একমাত্র দেশ হওয়ায় তাদের ম্যাচসংখ্যাও অন্য সব দলের চেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই লাল কার্ডের সংখ্যাও বেড়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপে হলুদ ও লাল কার্ড চালু হয় ১৯৭০ সালের আসর থেকে। তার আগে খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড প্রদর্শনের নিয়ম ছিল না। তাই ১৯৭০ সালের আগের বহিষ্কারের ঘটনাগুলো বর্তমান পরিসংখ্যানে গণনা করা হয় না।
ব্রাজিলের লাল কার্ড পাওয়া ফুটবলারদের তালিকায় বিভিন্ন প্রজন্মের তারকারা রয়েছেন। কখনও কঠোর ট্যাকল, কখনও প্রতিপক্ষকে আঘাত করা, আবার কখনও অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তারা মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে চাপের কারণে এমন ঘটনা বেশি ঘটেছে।
তবে ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয় মূলত তাদের আক্রমণাত্মক, নান্দনিক ও সৃজনশীল খেলায়। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকা থেকে শুরু করে নেইমার- প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিশ্ব ফুটবলকে অসাধারণ মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। তাই লাল কার্ডের পরিসংখ্যান কখনোই তাদের ফুটবল ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত লাল কার্ডের ঘটনাগুলোর একটি ১৯৯০ সালের ফাইনাল। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পেদ্রো মনসন বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে লাল কার্ড দেখেন। পরে একই ম্যাচে গুস্তাভো দেজোত্তিও বহিষ্কৃত হন।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচটি ‘ব্যাটল অব ন্যুরেমবার্গ’ নামে পরিচিত। সেই ম্যাচে রেফারি ১৬টি হলুদ এবং ৪টি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন, যা বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ডের রেকর্ড।
আফ্রিকার দল ক্যামেরুনও এ তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তুলনামূলকভাবে অনেক কম ম্যাচ খেলেও দলটি ৯টি লাল কার্ড দেখেছে। ফলে ম্যাচপ্রতি লাল কার্ডের হার বিবেচনায় তারা ব্রাজিলের চেয়েও এগিয়ে।
আধুনিক ফুটবলে অবশ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চালুর পর বিপজ্জনক ট্যাকল, কনুই মারা বা ইচ্ছাকৃত আঘাত আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি কোচরাও খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলার বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক। ফলে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে অপ্রয়োজনীয় লাল কার্ডের সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে।
ফুটবলে একটি লাল কার্ড কখনও দলের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, আবার কখনও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু কোনো দলের মোট লাল কার্ডের সংখ্যা দিয়ে তার ফুটবল ঐতিহ্য বিচার করা যায় না। ব্রাজিলই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ডের রেকর্ড যেমন তাদের, তেমনি পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও একমাত্র তাদেরই। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই দুই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ফুটবল কেবল সৌন্দর্যের খেলা নয়, এটি আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তীব্র লড়াইয়েরও প্রতীক।
এএন