দর বাড়ছে জুট স্পিনার্সের

জাহিদুল ইসলাম প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২, ০১:৫২ এএম

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাটশিল্পের প্রতিষ্ঠান জুট স্পিনার্সের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে প্রায় অর্ধযুগ ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য ছিল না লভ্যাংশ, হয়নি আর্থিক প্রতিবেদন।বেতন-ভাতা সংকটে একের পর এক চাকরি ছাড়তে থাকলে কোলাহলশূন্য হয়ে পড়ে প্রধান কার্যালয়। বর্তমানে সেখানে ১০-১২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দেখা মিললেও পুরো অফিসকক্ষই প্রায় নীরব। একমাত্র ব্যতিক্রম কোম্পানিটির শেয়ারদর। পাগলা ষাঁড়ের গর্জনে যেন এগিয়ে রয়েছে।

অফিস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হয়তো উৎপাদনে আসার তথ্য কোনোভাবে ফাঁস হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যতই তর্জন-গর্জন হোক, সবই অন্তঃসারশূন্য। মূলত মার্কেট ম্যানিপুলেশনের উদ্দেশেই এটি করা হচ্ছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের বিপরীতে যে পরিমাণ দায়-দেনা, তাতে আগামী এক দশকেও দাবিদাওয়া মিটিয়ে রাজস্ব হিসেবে মুনাফার অন্তর্ভুক্তি এক প্রকার অসম্ভব।

ডিএসইর তথ্য মতে, গত ৫২ সপ্তাহে শেয়ারদর ৯৪.৫০ টাকা থেকে বেড়ে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২৮ টাকায় অবস্থান করছিল। এই সময়ের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ১৩৩.৫০ টাকা বা ১৪১.২৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় আড়াইগুন বেশি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ডিএসইর পক্ষ থেকে কারণ জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মূল্য সংবেদনশীল বিষয়ে তাদের কাছে কোন তথ্য নেই। ফলে দেউলিয়াত্বের পথে থাকা জুট স্পিনার্সের শেয়ার নিয়ে আসলে কী হচ্ছে, এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।

প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন বিনিয়োগকারী জানান, ২০১৬ সালের পর আর কোন এজিএম হয়নি জুট স্পিনার্সের। ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বকেয়া পড়েছিল শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা।

এদিকে সঞ্চয় ও উদ্বৃত্ত তহবিলে ঘাটতির পরিমান প্রায় ২৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। শেয়ার প্রতি আয়ও চলে গিয়েছে ঋণাত্মক অবস্থানে, যেখানে শেয়ারপ্রতি ঘাটতি ৩২.৫০ টাকা। এরপরও বাড়ছে শেয়ারের দাম।

ডিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত দুই সপ্তাহ ধরে ডিএসইর টপ গেইনারের তালিকায় ছিল জুট স্পিনার্স লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন মাত্র সাড়ে তিন কোটি টাকার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন এক কোটি ৭০ লাখ টাকা।

এর মধ্যে পরিচালকদের মূলধন ৬৭ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা এবং শেয়ার সংখ্যা ছয় লাখ ৭৬ হাজার ৯৪০টি। সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের রয়েছে এক কোটি দুই লাখ ৩০ হাজার ৬০০ টাকা বা ১০ লাখ ২৩ হাজার ৬০টি শেয়ার। এত কম সংখ্যক মূলধন থাকায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে একটি চক্র, এমনটাই মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে দাম বৃদ্ধির কারণ জানা নেই, ইতোপূর্বে কোম্পানির পক্ষ থেকে এমনটি বলা হলেও গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ফের উৎপাদনে আসছে জুট স্পিনার্স। চলতি মাসেই ফের সচল হবে কারখানার মেশিনারিজ।

কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, মালিকপক্ষের ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলতি মাসেই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হবে। ইতোমধ্যে ঋণদাতা ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ ঘুরে গেছে খুলনার কারখানা। তবে তিনি মনে করেন, উৎপাদনে আসার এই তথ্য হয়তো কোনোভাবে প্রকাশ হয়েছে,যে কারণে বাড়ছে শেয়ারের দাম।

তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, উৎপাদনে আসার আগেই যে অবস্থা, তাতে মনে হচ্ছে উৎপাদন শুরু হলে শেয়ার দর ২৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকবে। বিনিয়োগকারীদের মতে, কোম্পানির যে অবস্থা তাতে আগামী এক দশকেও দায়-দেনা ও ক্ষতি কাটিয়ে মুনাফায় আসবে কি-না সন্দেহ। তারপরও এমন কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধির পেছনে হয়তো কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত রয়েছে। অনেকেই হয়তো মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের নামে শেয়ার কিনে রেখেছেন। আগাম তথ্য প্রকাশ করে দাম বাড়িয়ে নিজেরা লাভবান হলেও সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দিয়ে আসছে জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

ডিএসইর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত জুট স্পিনার্সের মোট ঋণের পরিমাণ ৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ আট কোটি ৯১ লাখ টাকা। এসবের বাইরে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক লোকসান আছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

জুট স্পিনার্সের এক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি পুনঃউৎপাদনের আসার আগে খুলনার কারখানা পরিদর্শনে যায় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এরপর কোম্পানির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার কিনতে থাকে ব্যাংকটি। এ ছাড়া কোম্পানির কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে শেয়ার কিনে রাখছেন বলে জানা গেছে।

তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদনের আসার এই খবরটি প্রকাশও কোম্পানির একটি অপকৌশল। তারা বলছেন, কোম্পানি ডিএসইকে জানিয়েছে তাদের কাছে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। অথচ তারাই আবার বলছে উৎপাদনে আসছে। তাহলে কোনটি সঠিক? অনেকের মতে, এমন খবর প্রচার করে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কেউ হয়তো শেয়ার দর বাড়াতে চাইছেন।

দুর্বল মৌলভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের এমন উচ্চদরের কারণ জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, মার্কেটে স্পেকুলেশন থাকবেই। সেটা যুক্তরাস্ট্রের বাজার হোক বা বাংলাদেশেরই হোক। একজন শেয়ার কিনতে চাইলে তো বাঁধা দিতে পারি না। তবে মার্কেটে ম্যানিপুলেশন হচ্ছে কি-না, সেটা দেখতে হবে। আমরা এসব বিষয়ে তদন্ত করছি। অনিয়ম খুঁজে পেলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।