নাম টেকাতে মানের মরণ

মো. নাঈমুল হক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৩, ১১:০০ এএম

সময় দেয়া হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে

—তপন কুমার সরকার

চেয়ারম্যান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড

 

পরপর তিন বছর একই রকম চলতে থাকলে ওই প্রতিষ্ঠান

বন্ধ করা প্রয়োজন

—ড. মীজানুর রহমান, সাবেক ভিসি, জবি

 

শিক্ষার মান নয় বরং নাম বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টার কারণেই শতভাগ ফেল করেছে ৫০ কলেজ। সম্প্রতি এইচএসসি ২০২২-এর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পরীক্ষায় এক হাজার ৩৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সব শিক্ষার্থীই পাস করলেও গত বছরের চেয়ে ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, শতভাগ ফেল করা সবগুলো কলেজের পরীক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২০০। একজন পরীক্ষা দিয়েছে— এমন কলেজের সংখ্যা ১০টি। ২০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী পাস করেছে— এমন কলেজের সংখ্যা ৬২। অভিযোগ আছে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর পাঠদান হয় না। নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। কাগজে-কলমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের দেখা মেলে না। প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষার আগে নামমাত্র পরীক্ষার্থী বসান। উদ্দেশ্য কলেজের নাম টিকিয়ে রাখা। যদিও কয়েকটি কলেজ অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। সময় দেয়া হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিক্ষাবিদরা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদারকি বাড়ানো উচিত। পরপর তিন বছর একই রকম চলতে থাকলে ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন।

এইচএসসি-২০২২ পরীক্ষায় শতভাগ ফেল করা ৫০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বোর্ডের ৮টি, রাজশাহীর ৯টি, কুমিল্লার ৫টি, যশোরের ৬টি, দিনাজপুরের ১৩টি, ময়মনসিংহের ৩টি, মাদ্রাসা বোর্ডের ৪টি এবং কারিগরি বোর্ডের দুটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করেছে।

দিনাজপুরের সনকা আদর্শ কলেজে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দুপুরের দিকে  প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো শিক্ষক ও ছাত্রকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্রছাত্রী নেই বললেই চলে। পর্যাপ্ত বেতন না থাকায় শিক্ষকদের তেমন দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানের নাম বজায়

 

রাখার জন্য এ বছর তিনজনকে পরীক্ষায় বসানো হলেও একজনও পাস করেনি।

সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীর হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দেখা যায়, ছুটির দিন না হলেও এ প্রতিষ্ঠানে সুনসান নীরবতা। দুপুর শেষ হতে না হতেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীশূন্য প্রতিষ্ঠানটি। এমন খামখেয়ালিপনার কারণেই ২০২২ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে সাত পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় বসলেও কেউই পাস করতে পারেনি।

শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে সিরাজগঞ্জ সদরের রেলওয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজও। কলেজের নাম রক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজনকে বসানো হয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষায়। কিন্তু হয়নি কাজের কাজ। অধ্যক্ষ বলছেন, শিক্ষক না থাকায় ডুবছে তার কলেজ।

সম্প্রতি রাজধানীর মালিবাগের অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ কলেজে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী নেই। প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় একদল অভিভাবক বসা, যাদের সঙ্গে রয়েছে শিশুরা। দোতলার অফিসকক্ষে গিয়ে কথা হয় এক শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এখানে স্কুল ও কলেজ আলাদা চলে। এখন স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছে। অবশ্য অধ্যক্ষ বললেন, বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থাকায় এ দিন তারা আসেননি। তাদের কলেজ থেকে এবার ২৭ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। কিন্তু পরীক্ষা দেয় মাত্র তিনজন। বাকি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আসার পর তাদের বাড়িতে গিয়ে বুঝিয়েও পরীক্ষায় বসাতে পারেননি। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে কলেজটিতে এখন ৩০ শিক্ষার্থী ও ২৪ শিক্ষক আছেন বলে জানালেন অধ্যক্ষ।

ময়মনসিংহ বিভাগে ফেল করা তিনটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা দাবি করেছেন, আমাদের সব পরীক্ষার্থী ফেল করতে পারে না। কোথাও ভুল হয়েছে। সেজন্য আমরা আপিল করেছি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা মোট ১০ জন।

একজ করে শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে— এমন কলেজগুলো হলো : নাটোরের সিংড়ার শেরকোল আদর্শ কলেজ,  সিরাজগঞ্জ সদরের এসবি রেলওয়ে কলোনি স্কুল ও কলেজ, পীরগঞ্জ কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হাতিবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া মহিলা কলেজ, ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর লাক্ষীপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাহপুর উপজেলার নলডাঙ্গা মহিলা কলেজ, শিবরামপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, এখন নিজস্ব জমি ও অবকাঠামো ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সুযোগ নেই। কিন্তু একসময় নানা কৌশলে অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে পাঠদানের অনুমতি বা স্বীকৃতি পেয়ে যেত। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করছে না, তাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এ জন্য তাদের আরও সময় দেয়া হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদারকি বাড়ানোর কথা জানিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. মীজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের নাম বজায় রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসান। কিন্তু সারা বছর সে প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয় কি না, এ ব্যাপারে বোর্ডগুলোর তদারকি বাড়ানো উচিত। যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম, তাদের আশেপাশের প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে। পরপর তিন বছর খারাপ ফল করলে ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া উচিত।