বিহারিদের মানবেতর দিনযাপন সুষ্ঠু সমাধান হওয়া উচিত

বলতে গেলে বাংলাদেশে ৫ লাখ আটকা পড়া বিহারি এক ধরনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে। অন্যায় দৌরাত্ম্য ভালো নয়, তার পরিণাম ভালো হয় নাÑআটকা পড়া বিহারিদের মানবেতর দিনযাপন হচ্ছে তার একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলো বিহারিরা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ডিসপারেট ভূমিকা পালন করেছিলো তারা পাকিস্তানের পক্ষে। জামায়াতের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছিলো।

বাঙালিদের হত্যা করে হাত রক্তাক্ত করেছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তারা তাদের কলোনীগুলোতে আত্মসমর্পণ করেনি। বুদ্ধিজীবী হত্যায়ও তাদের হাত ছিলো। যে পাকিস্তানের জন্য এত কিছু, কেন পাকিস্তান বিহারিদের ফেরত নিলো না? আর ১৯৪৭ সালেই বা উর্দুভাষী বিহারিদের পশ্চিম পাকিস্তানে না পাঠিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ পূর্ব বাংলায় পাঠানো হয়েছিলো? এর উত্তর জানা নেই।

 ৩ আগস্ট দৈনিক আমার সংবাদ বিহারিদের মানবেতর দিনযাপন নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি নন বাঙালি যারা আছে তারা আমার ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের।’ এ কথা বঙ্গবন্ধু না বললে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিহারিদের শেষ করে ফেলতো। সেই মানবতা এখনো ভোগ করে যাচ্ছে আটকা পড়া বিহারিরা। কথায় কথায় পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরিন বিষয়ে নাক গলিয়ে থাকে। আইএসআইকে লাগিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের পেছনে, অথচ ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অনেক দেনদরবার করার পরও পাকিস্তান বিহারিদের ফেরত নেয়নি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের ঘাড়ের ওপর উর্দুভাষী পাকিস্তান দরদীদের রেখে দিয়েছে। এটাও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকিস্তানের।

দেশের ১১৬টি ক্যাম্পের ৪ লক্ষাধিক উর্দুভাষী বিহারি দিনযাপন করছে সীমাহীন দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে। এটা ইতিহাসের পরিণতি। যে দেশের বিরুদ্ধে তারা শত্রুতা করেছে, এখন সে দেশেই তাদের বসবাস করতে হচ্ছে, যে দেশকে ভালোবেসে তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো, সে দেশ তাদের গ্রহণ করলো না। এটাকে নিয়তির পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?  ছোট ছোট  খুপড়ি ঘরে একাধিক পরিবার নিয়ে বাস করছে ক্যাম্পের বাসিন্দারা। অর্থাৎ বিহারিরা। পানির অপর্যাপ্ততা, শৌচাগার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকটসহ নানা সমস্যার মধ্যে তাদের দিন কাটে। বর্ষার দিনে সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। বৃষ্টির পানি যেন নামতেই চায় না।

ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হওয়ায় অনেক সময় ঘরের ভেতর হাঁটু পরিমাণ পানিতে বাস করতে হয়। দুর্বিষহ বিড়ম্বনায় ভরা বিহারি ক্যাম্পের জীবন। এর জন্য দায়ি তো পাকিস্তান। তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। বাংলাদেশ বিহারিদের প্রতি যে উদারতা দেখিয়েছে, এর চেয়ে বেশি উদারতা দেখাবার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই। তবে এ কথা ঠিক যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে অর্ধ শতাব্দী প্রায়। এখন বিহারি ক্যাম্পে যারা মানবেতর জীবন যাপন করছে তারা সমকালিন একটি প্রজন্ম। তারা তাদের পিতৃ পুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে। প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চিত বাস্তুহারা জীবন যন্ত্রণা ভোগ করছে তারা। তারা আছে উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে।

বাংলাদেশ সরকার যেহেতু তাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে, সেহেতু তাদের সুবিধা অসুবিধা দেখার দায়িত্ব আছে সরকারের। আর বিহারিদেরও উচিত ‘বিহারি’ নাম ঘুচিয়ে বাঙালি পরিচয় ধারণ করা, এ দেশের মা-মাটি-মানুষকে ভালোবাসা।

এ দেশের কালচারে অভ্যস্ত না হলে, এ দেশের  শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে, বিশ্বাসে ও চেতনায় ফাঁক রেখে আটকা পড়া বিহারিরা তাদের দুর্দিন ঘোচাতে পারবে না। কোনো অধিকারের ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না তারা।
তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি স্পষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করা উচিত। পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়া উচিত। তাহলে তারা এই দেশের সহানুভূতি পাবে।