গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি উভয় সংকটে পড়েছে সরকার

পুনরায় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক বছর শেষ হতে না হতে ফের গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ভোক্তাদের মধ্যে। এ নিয়ে সরকারও উভয় সংকটে পড়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে গ্যাসনির্ভর জনগণের একটা প্রত্যাশা থাকে যে, প্রতিবছর সহনশীল কৌশলে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে, এতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও সাধারণ ভোক্তাকে গ্যাসক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে একই বছরে দুবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

প্রতিহাজার ঘনফুট গ্যাস সঞ্চালন চার্জ ১৫ পয়সা থেকে ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ২৯ পয়সা করার সুপারিশ করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিআই আর সি)র কারিগরি কমিটি। গত রোববার রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত গণশুনানিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের সঞ্চালনচার্জ শূন্য দশমিক ১৫৬৫ থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৩৬৬৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। হুইলিং চার্জ বাড়ানোকে অযৌক্তিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গণশুনানিতে ভোক্তারাও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে সরকারের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলেছে। এ দিকে গণশুনানি চলাকালে বিআইআরসির প্রধান গেটের সামনে গ্যাসের দাম না বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি সংগঠন মিছিল-সমাবেশ করেছে। এতে উভয় সংকটে পড়েছে সরকার।

একদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে গ্রাহকশ্রেণির ওপর এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে ভাবতে হচ্ছে সরকারকে।
বক্তারা বলেন গণশুনানিতে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসসহ সকল যানবাহনের ভাড়া, চাল-ডাল-তেল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে দেশের বিশাল অংশের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। বাড়ে তাদের ভোগান্তি। আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম, শামসুল আলম বলেন, এক বছরে দু’বার এবং বর্তমান বছরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর গ্যাসের দাম গড়ে ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। বিআই আর সি আইন-২০০৩ অনুযায়ী এক বছরের মধ্যে দু’বার দাম বাড়ানোর বিধান না থাকলেও ৮ মাসের মাথায় আবারো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে কোম্পানিগুলো। আর তা নিয়ে এখন শুনানি করছে বিআইআরসি। অবশ্য কোনো কোনো বক্তা গ্যাসের দাম শিল্প-বাণিজ্য ও সাধারণমানুষের কাছে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বিআইআরসির কাছে অনুরোধ জানান।

তবে বর্তমান সময়ে কোনো কারণ ছাড়াই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএম ই এ,ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনডাস্ট্রি। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। শিল্পখাতে গ্যাসের পরিবর্তে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিও উঠে আসে এ সব ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে। তাদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সহ শিল্পখাতে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতিও হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ফলে সরকারের ভিশন ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে সরকার। একদিকে তরলীকৃত প্রাকৃিতক গ্যাস আমদানির উদ্যোগ এবং বিদ্যমান গ্যাস বিক্রি থেকে সংগৃহীত রাজস্ব গ্যাস খাতেই ব্যয় করার পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করায় মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। এ সব কিছু নিয়েই ভাবতে হচ্ছে সরকারকে।
আমরা আশা করবো সরকার সব কিছু তলিয়ে ভেবে গণমুখী সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে সহনশীল পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবই যৌক্তিক। নতুন গ্যাসক্ষেত্র উদ্ভাবন এবং গ্যাসের অপচয় বন্ধের পদক্ষেপও নিতে হবে।