জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

 ১৫ আগস্ট জাতির কলঙ্কনীয় এক কালো অধ্যায়ের নাম। বর্বর পশুত্বের কি এক নির্মম ইতিহাসের বাঁকা পথে জাতি শোক সাগরে মূহ্যমান। ওঁৎ পেতে বসে থাকা হায়েনারা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক ভাবনায় গড়ে উঠা অসাম্প্রদায়ীকতার সকল প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বকে ভেঙ্গে চূরমার করে দিল। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সকল ব্যবস্থাপনায় ওরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বেলে তুললে, দ্বি-জাতি তত্ত্বের পাকিস্তানি ভাবনার সাম্প্রদায়িকতার উৎসে বেড়ে উঠা সকল ব্যবস্থাপনা তৈরি হল। দীর্ঘসময় তারা বন্ধুকের নলের আগা থেকে বেরিয়ে আসায় তত্ত্বকে সামনে রেখে সংসদে বসে বাঙালি জাতির জনকের সকল ভাবনাসহ স্বাধীন তত্ত্বার সবকিছুকে কালো কালি দিয়ে মুছে দিল। মনে হয়েছিল গভীর অমাবস্যার রাত বুঝি শেষ হবে না।

ইতিহাস কথা কয়। ইতিহাসের অমর বাণী বাস্তবের ধারা থেকে উচ্চারিত হয়, উজ্জীবিত হয়। ছাই থেকে স্বর্ণকে খুঁজে বের করতে হয়। এমনি বাস্তবতায় চরম মৃত্যু ঝুঁকিকে সামনে রেখে হারাবার আর কোন ভয় না রেখে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতির হাল ধরলেন। অসম্ভব বৈরী আবহাওয়ায় হাজারও কু-হত্যা, বন্ধুর গিরিপথ পেরিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মানসকন্যা জনগণের একান্ত সমর্থনে সংসদে আসলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অমর আসনে বসে কী এক বিস্ময়কর ভাবনার মধ্যদিয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় জীবনের সকল পরিধীতে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির যে বিশাল উত্থানের দেয়াল গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে তারা দম্ভভরে বলিয়ান হয়েছিল, সবগুলোকে বিশেষ পরিকল্পনার আদলে নিয়ে সকল বাধা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সর্ব প্রথম ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করালেন।

জাতির কলঙ্ক কিছুটা হলেও মুক্ত করলেন। তারপর স্বাধীনতা বিরোধীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল চক্রকে চিহ্নিতকরণ এবং তার বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়াবার সকল উজ্জ্বীবিত শক্তিকে উত্তোরণ ঘটিয়ে সঠিক পর্যায়ে নির্বাচন মেন্ডেটে ঘোষণা করলেন। অভাবনীয়ভাবে তরুণ প্রজন্মসহ জনগণ এগিয়ে এসে দ্বিতীয় দফায় সংসদে বসালেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সকল চিহ্নিত মীর জাফরদের একে একে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করানো এই প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবতায় পরিণত করলেন। জাতি সম্পূর্ণভাবে কলঙ্কমুক্ত হওয়ার পাশা-পাশি ষোল কোটি মানুষের দেশাত্ববোধের নির্মল ভালবাসা নিয়ে ইস্পাত কঠিন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। সাহসী বাস্তবায়নের বিশেষ পদক্ষেপে এগিয়ে চলতে বৈশাখী ঝড়ের মহাগতিতে সমস্ত বাধা বিঘ্ন (দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক) জ্বালাও পোড়াও, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের সকল কালো থাবাকে জনগণকে সাথে নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা রুখে দিতে সক্ষম হয়েছেন। জাতীয় নেতা থেকে আন্তর্জাতিক নেতায় পরিণত হলেন। স্বদেশি শক্তি এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিতে উজ্জ্বীবিত হয়ে সারা বিশ্বকে জানান দিলেন আমরাও পারি।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিশ্বদাতা সংস্থাদের সকল শর্তকে বাজি রেখে জাতিসংঘের সহস্রাব্ধ উন্নয়নের প্রায় সকল সূচিকে দারুণ ফলাফলে দেখিয়ে দিলেন আগামীতে বিশ্বের চালিকাশক্তিতে বাংলাদেশ অধিষ্ঠিত হতে পারে। কী এক যাদুর স্পর্শে খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ডিজিটাল বাংলাদেশে উত্তোরণ অবকাঠামোতে কালজয়ী এগিয়ে চলা, ২০১৮ সালের মধ্যে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর বাস্তবে গতিশীলতা, আশ্চর্যজনকভাবে নিম্ন ব নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে দেশের ৩ কোটি মানুষকে মধ্যম আয়ের বৃত্তে উঠানো, মেয়েদের ক্ষমতায়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য, স্বাস্থ্য ও ওষুধ শিল্পে স্বয়ংভরতা ও রপ্তানিতে অনুপ্রবেশ। বৈশিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংম্বরতা, বিশ্ব উষ্ণায়নে পরিবর্তিত জলবায়ুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে ঘুরে দাঁড়ানো, চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুতের কাছাকাছি পৌঁছানোর সাফল্য, পারমাণবিক চুল্লির মাধ্যমে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, আন্তঃমহাদেশীয় কানেকটিভিটি, আভ্যন্তরীণভাবে ঢাকা নগরীকে আধুনিক সাজে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে নগরের গণপরিবহনে বিশেষ পরিবর্তন, সারা ঢাকা ফ্লাইওভারে সজ্জিত এবং মেট্রোরেলের কার্যক্রম।

পাশা-পাশি পায়রা সমুদ্রবন্দর স্থাপন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেন সমাপ্ত, সর্বশেষ মিলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যমআয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধশালী আত্মমর্যাদাশীল বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানো। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে সকল পরাশক্তির সাথে সামঞ্জস্যভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বস্ব দিয়ে সাহায্যকারী দেশ, বন্ধুপ্রতীম ভারতের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা এ সবকিছুই টেকসই উন্নয়নের ধারার এগিয়ে চলার দৃশ্যমান লক্ষণ নয় কি?

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি নিয়ে অসাম্প্রদায়িক এগিয়ে চলার এভারেস্ট বিজয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, মানবতাবিরোধী সাজাপ্রাপ্তদের বংশধর এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের জঘন্য কার্যকলাপের বহিঃপ্রকাশ অতি সম্প্রতি জ্বালাও-পোড়াও, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতাবাদের উগ্র বাস্তবতাকে সঠিক জবাব দিয়েছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলার বাহিনী। জনগণও আকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সমন্বীতভাবে বর্ণ, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে একাট্টা হয়ে জানিয়ে দিয়েছে বাংলার মাটিতে জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতার ভাবনার কোনো স্থান নেই। স্মৃতিপটের ভাবনায় কথা উঠে বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে হয়তো বা মাহাথির মোহম্মদ’র মালয়েশিয়ার সমকক্ষ বা তার চেয়েও সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতো। তার পরেও বলতেই হয় হে বঙ্গবন্ধু তোমাকে তাৎক্ষণিকভাবে হারিয়ে জাতি হতবিল ও শোক সাগরে ভেসেছে ঠিকই, কিন্তু দিশেহারা হয়নি। তোমার সুযোগ্য কন্যা বিশ্বনেতা জননেত্রী শেখ হাসিনা তোমার সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর।

অপার সম্ভাবনার সেই সোনার বাংলাকে বিশ্ব দরবারে সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সকল কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সকল বাধা বিঘ্নকে মাড়িয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলেছেন। এ জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সহায় হোন। শোকের এই মহাসন্ধিক্ষণে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি এবং জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।