নির্দয় অ্যাম্বুলেন্স কেড়ে নিলো অনাগত শিশুকে ঘাতক চালকের শাস্তি হোক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চাপায় এক গর্ভবতী মা ও মা-ছেলেসহ নিহত হয়েছেন ৪ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ জন। গত শনিবার ১৫ অক্টোবর সকাল সোয়া ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। অ্যাম্বুলেন্সটির চালক ও তার সহকারীকে আটক করেছে পুলিশ। জানা গেছে, গত শনিবার সকাল সোয় ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত গতিতে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে। এ সময় পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দাঁড়ানো লোকদের চাপা দিয়ে বেপরোয়াভাবে অ্যাম্বুলেন্সটি জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে। এতে ঘটনাস্থলেই ২জন মারা যান। আহত হন ৭জন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটায় মারা যান এক মহিলা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর পরই আহত অবস্থায় অন্তঃসত্ত্বা আমেনা বেগমকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হয়। সেই সময় তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তবুও তাঁর অপারেশন করা হয়। এতে গর্ভের সন্তানটি পৃথিবীর আলোর মুখ দেখার আগেই মুকুলের মতো ঝরে যায়। এরপর আমেনা বেগমকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠানো হলে চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনিও সন্ধ্যা ৬টার দিকে মারা যান। আমেনার স্বামী জাকির হোসেন একজন ট্রাকচালক। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, গত ২৫ আগস্ট জাকির হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে- স্ব^ামীর সেবা করতে এসেছিলেন সন্তান সম্ভবা আমেনা বেগম। ৬ মাসের গর্ভবতী আমেনা বেগম তার ট্রাকচালক স্বামী, দুর্ঘটনায় আহত জাকির হোসেনকে সেবা করছিলেন। শেষে তার পরিণতি এই হলো। হাসপাতালের বেডে শায়িত জাকির হোসেনকে দেখতে হলো স্ত্রী-সন্তানের লাশ। তার চোখে অবিরল অশ্রুধারা আর অন্ধকার নেমে এসেছে। শুধু জাকির হোসেনেরই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেনি, তার মতো ফেরদৌস নামের একজনেরও সকল সুখ, স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সটির চাপায় চোখের সামনে ৭বছরের ছেলে সাকিব মারা যান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটার দিকে ফেরদৌসের স্ত্রী গোলেনুর মারা যান। তিনিও পেশায় ভ্যানচালক। তাদের ছেলে সাকিবের মাথায় সমস্যা ছিলো। তার চিকিৎসার জন্য স্বামী-স্ত্রী দুই ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন ঢামেক হাসপাতালে। এসেই অ্যাম্বুলেন্সের চাকায় পিষ্ট হলেন ১ ছেলেসহ গোলেনুর। অসহায় হয়ে পড়েছেন দিশেহারা ভ্যানচালক ফেরদৌস। একেই বলে নিয়তি। মানুষ নিয়তির শিকার। দুটো পরিবারই ঢামেক হাসপাতালে এসেছিলো চিকিৎসার জন্য। দুটো পরিবারই শ্রমজীবী। চিরদিনের মতো চিকিৎসার কাজ শেষ করে দিলো বেপরোয়া অ্যাম্বুলেন্স-চালক। ঘাতক-চালক সোহেল মিয়ার ছবি ছাপা হয়েছে সহযোগী একটি দৈনিকে। কী ভয়ঙ্কর চেহারা! দেখলে পিলে চমকে ওঠে। বয়স বেশি না, মাত্র ১৮ বছর। স্থানীয়রা জানান, এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ‘মানব সেবা’ নামক ওই অ্যাম্বুলেন্সটির চালকের সহকারী সোহেল মিয়া। চালকের বদলে সোহেল অ্যাম্বুলেন্স চালাতে গেলে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। অ্যাম্বুলেন্সটির মালিক ঢামেকের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী মাহফুজ ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নাসির। 

এই ট্রাজিক ঘটনার সঙ্গে লোভ, দায়িত্বহীনতা, হৃদয়হীনতা জড়িত। সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে ‘নির্দয় অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য, সরকারি হাসপাতাল ঘিরে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের রমরমা ব্যবসা।’ এই ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিই অনাগত এক শিশুসহ ৪টি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোঃ নাসিম বলেছেন, চালকের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমাদের দাবি, মূল চালক, মালিক ও সহকারী সোহেলের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। পুরো পরিবহন খাত ও চিকিৎসা খাতে লোভের পাপ ঢুকেছে। এ দুটি খাতের মানবতাবর্জিত কর্মকা- দূর করতে হবে।