বেড়েছে শিশু নির্যাতন দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

পত্র-পত্রিকায় এসেছে, শিশু নির্যাতন ও শিশু ধর্ষণ বেড়ে গেছে। এই খবর দেশের জন্য, সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। জীবনের শুরুতেই ধর্ষণের মতো বীভৎসতার ক্ষত নিয়ে শরীরে ও মনে বেড়ে উঠছে অনেক শিশু। ১ বছরেরও কম বয়সী শিশু থেকে বিভিন্ন বয়সের শিশুরা ধর্ষণের মতো বর্বরতার শিকার হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিমাসে গড়ে ৩৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। গত ২৭ অক্টোবরের পত্রিকায় এসেছে, দিনাজপুরে ধর্ষণের শিকার ৫ বছর বয়সী শিশুর শরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষত করা হয়েছে। এই ক্ষত হাড় পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে করে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

শিশুটির শরীরে অস্ত্রোপচারের জন্য ১ থেকে ২ মাস অপেক্ষা করতে হবে। তাই এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকেই গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তার চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কেস স্টাডি থেকে জানা যাচ্ছে, দুর্বৃত্তরা নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে কন্যা-শিশুদের আড়ালে-আবডালে নিয়ে ধর্ষণ করছে। ধর্ষিতা শিশুরা জীবনের প্রারম্ভে এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। ২৬২টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহের জাতীয় নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩২৫ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়।

৩১টি প্রতিবন্ধী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৫ টি গৃহকর্মী-শিশু কর্মস্থলে ধর্ষণের শিকার হয়। ১৫টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, ৫ থেকে ১২ বছরের কন্যা শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেশি। এ সব হতভাগা শিশুদের ধর্ষণ করা হয়েছে চকলেট, খেলনা, সৌখিন জিনিস দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে, কোনো নির্জনস্থানে নিয়ে, বাড়িতে একা পেয়ে। সূত্র জানাচ্ছে, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে। জোরপূর্বক তুলে নিয়ে নাবালিকাদের ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

২০১৫ সালে ৫২১টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিলো ১৯৯ এবং ২০১৩ সালে ১৭০টি, ২০১২ সালে ৮৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মাত্রা তত বাড়ছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন বাড়ছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। যে দেশ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে, সে দেশের নৈতিক অধপতনের ক্রমাবনতি আশা করা যায় না। নিশ্চয়ই মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। যে দেশের শিক্ষার হার বেড়ে গিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সে দেশে প্রতি বছর শিশু ধর্ষণের হার বাড়ছে, তা চিন্তা করা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে অনেক বক্তব্য এসেছে শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্পর্কে। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, কম সময়ে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতেই শিশু ধর্ষণের মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে। এ ছাড়া বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশনে ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। আইনের শাসনের যথার্থ প্রয়োগের প্রশ্নটি তো আছেই, মানবিক মূল্যবোধের চচার্, সাংস্কৃতিক ও সুস্থ বিনোদন চর্চা বাড়ানো দরকার। সরকারি ফরমানে সব অপরাধের শোধন হয় না। দরকার মূল্যবোধ গঠনের। যে শিশুদের ফেরেস্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়, সেই শিশুদের ধর্ষণের কুপ্রবৃত্তি সমাজের গভীর থেকে নির্মূল করতে হলে সমাজে মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানোর বিকল্প নেই। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে। তারপর সামাজিক মূল্যবোধ গঠনের দিকে নজর দিতে হবে।