Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

আধুনিকের ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে পাইয়ামালা

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২, ০৪:১৮ পিএম


আধুনিকের ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে পাইয়ামালা

বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়াতে হারিয়ে গেছে পুরনো দিনের ধান-চাল পরিমাপ করার উপকরণ আড়ি, সেরি ও পাইয়ামালা। এইসব উপকরণ দিয়ে পরিমাপ করা হত ধান, চাল, কুড়া, বীজসহ আরো অনেককিছু। একটা সময় গৃহস্থ পরিবারে এসব উপকরণ না থাকলে তাদের বদনাম হতো। এমনকি আত্মীয়স্বজন করার জন্য এক পরিবার অন্য পরিবারের সাথে বিয়ের কথাবার্তা বলাবার সময় খোঁজখবর নিতো এইসব উপকরণ সেই পরিবারে আছে কি না। যেই পরিবারে আড়ি বা সেরি দিয়ে পরিমাপ করে ভাত রান্না করা হতো সেই পরিবারকে প্রাধান্য দিতো।

সেইসময়কার কৃষিকাজ করার জন্য বাজার থেকে কাজের মানুষ (কামলা) নিতো। সেই ক্ষেত্রেও পছন্দের একটি বিষয় থাকতো, তা হলো যেই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ভাত খাইতে পারতো তাকেই কামলা হিসেবে পছন্দ করা হতো, কারণ যেই সবচেয়ে বেশি খাবার খাবে সেই ব্যক্তি কাজ সবচেয়ে বেশি করতে পারবে। খাবার কম খাইলে তাদের আর কাজে নিতো না। এখন কেউ শারীরিক পরিশ্রম করতে চায় না, আর কেউ পরিশ্রম করলেও অল্প সময়ের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মানুষের ভাত খাওয়ার অভ্যাসও কমে গেছে। কোনো মানুষ এখন আর পূর্বের মতো তেমন খাবার খাইতে পারে না। অবশ্য এখন মানুষ ভাতের পরিবর্তে চা, নাস্তা ও নানা কিছু খাচ্ছে। আর যেসব জিনিস খাচ্ছে তার অধিকাংশই ভেজাল, পচা ও বাসি যা খাওয়ার অযোগ্য। এসব খাওয়ার খেয়ে মানুষ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে মানুষ সব সময় মৃত্যুর ঝুঁকিতেও থাকে। পাইয়ামালা নারকেলের মালা কেটে তৈরি করা হতো, এটা দিয়ে পরিমাপ করতো চার পোয়াতে এক সের। বেত দিয়ে তৈরি করা হতো সেরি ও আড়ি। আড়ি সেরিতে তৈরি করে অনেক বেত ও বাঁশ শিল্পী জীবিকা নির্বাহ করতেন। মৌসুমে এই আড়ি সেরির কদর ছিল অনেক বেশি। বেত পাওয়া দুষ্কর হওয়ায় এসব জিনিস এখন কেউ তৈরি করে না। আর যারা এসব জিনিস তৈরি করতেন তারাও অনেকে এখন আর বেঁচে নেই।

এখনকার লোকজন এসব জিনিস তৈরিতে তেমন আগ্রহী না, কিংবা এসব জিনিস তৈরির কাজ আর কেউ শিখতেও চাই না। তবে প্রয়োজনের জন্য অনেকে বাঁশ বেতের তৈরি আড়ি সেরির পরিবর্তে টিনের কৌটারকে পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করছে। সেসব পরিমাপকও হারাবার পথে। পুরনো সেই পরিমাপক এখন প্রায় ভুলতে বসেছে। এখন উন্নত প্রযুক্তিতে ডিজিটাল পরিমাপক আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে অতীতের সেই পরিমাপক জিনিসপত্র এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারের সংখ্যা গ্রামে একদম নাই বললেই চলে। দিন বদলের কারণে এখন আর বউঝিরা যৌথ পরিবারে থাকতে চায় না।

প্রায় প্রত্যেকেই পৃথক হয়ে ছোট সংসার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তাই এখন গ্রামে যৌথ গৃহস্থ পরিবারগুলো সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। এই ভাগাভাগি করতে গিয়ে সামান্য বিষয়ে ঝগড়াঝাঁটি বাড়ছে। গৃহস্থ বাড়িতে ভাত রান্না করার সময় পরিবারের সদস্যদের সংখ্যানুপাতে পাইয়া মালা দিয়ে চাল পরিমাপ করে দেয়া হতো। শাশুড়িরা পুত্র বধূকে ভাত রান্না করার সময় মটকা থেকে পাইয়া মালা দিয়ে চাল পরিমাপ করে দিত। এখন পাইয়া মালার স্থান দখল করে নিয়েছে টিনের কৌটা। আড়ি ও সেরি এখন উঠে গেছে। এসব জিনিস বাজারেও দেখা যায় না। অবশ্য কোনো কোনো মেলায় এসব জিনিস দেখা গেলেও দাম অত্যন্ত চওড়া। আড়ি, সেরি পরিমাপক নির্মাণের উপকরণ বেত আর বাঁশ পাওয়া গেলেও এসব উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আড়ি সেরির দামও বেশি। আর টিন কেটে এসব জিনিস বিকল্প তৈরি করা যায় বলেও এগুলোর কদর কমে গেছে।তবে ডিজিটাল মেশিনের (ডিজিটাল মিটার) বদৌলতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হওয়া সেরি ও আড়ি পরিমাপক পাইয়া মালা।

বর্তমান যুগের সন্তানদের কাছে এ বিষয়গুলো জাদুঘরের গল্প কাহিনী মনে হবে বলে স্থানীয় কয়েকজন মুরুব্বিরা জানান।

কেএস

Link copied!