Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়

ফের বাড়ানো হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা

জাহিদুল ইসলাম

জাহিদুল ইসলাম

মে ১৩, ২০২২, ০২:১০ এএম


ফের বাড়ানো হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা
  • চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা
  • মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে ব্যাপক হারে, দুর্বিষহ হবে জনজীবন
  • ধনীদের করহার বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হ্রাস করা প্রয়োজন: ড. রেজা কিবরিয়া
  • সরকারের ব্যয় সক্ষমতা কমে দায়ভার বাড়ছে  এনবিআর পুনর্গঠন প্রয়োজন: ড. আহসান এইচ মনসুর

গত দুই অর্থবছর ধরেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ ছিল। কিন্তু এরপরও আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে। গত এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় অর্থমন্ত্রী আসন্ন বাজেট সংক্রান্ত প্রাথমিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করলে এই তথ্য জানা যায়। 

এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে মুদ্রাস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে। এমনকি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ফেলবে ব্যাপক প্রভাব, এমনটা বলছেন বিশ্লেষকরা। ফলে যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই লক্ষ্য নির্ধারণ হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্ন উঠেছে। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৭৪ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বেশি। যদিও এটাই চূড়ান্ত নয়। এর মধ্যে আয় চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ধরা হয়েছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি বাজেট ছিল দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী বাজেটে আয় ও ঘাটতি উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দিন শেষে ঘাটতিই বাড়বে বলে মনে করছেন আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা।

প্রাথমিক বাজেট পরিকল্পনায় এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এটা ছিল তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত সংস্থাটি আদায় করেছে দুই লাখ চার হাজার আট কোটি টাকা। প্রতি প্রান্তিকে গড়ে আদায় হয়েছে ৬৮ হাজার দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা। 

এই হিসাবে বছর শেষে এনবিআরের আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে দুই লাখ ৭২ হাজার ১০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৮৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
    
এদিকে নিয়মিত রাজস্ব ঘাটতি বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসন্ন বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৯ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। 

এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতেও বরাদ্দ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী বাজেটে এডিপির সম্ভাব্য আকার হতে পারে দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ আছে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে গত কয়েক বছর যাবত এনবিআরে উচ্চমাত্রার লক্ষ্য নির্ধারণ ও অর্জনে ব্যর্থতার বিষয়টিকে সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

তাদের মতে, এনবিআরের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না করে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়বে। এমনকি আগামী বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হার চলতি অর্থবছরের ৫.৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.৫ নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতিকে কোনোক্রমেই এই সীমায় আটকে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ সরকারি হিসাব মতেই দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার ৬.১ শতাংশ। 

যদিও বেসরকারি হিসাব বলছে, এটি ১০ শতাংশের ওপর। এমন প্রেক্ষাপটে আরেক ধাপ মুদ্রাস্ফীতি হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে। ইতোমধ্যে এর প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমাগত নিচের দিকে।

অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটের প্রভাব কেমন হতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়ার কাছে। তিনি দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘লক্ষ্য অর্জনে বারবার বিফল হওয়ার পরও প্রতিবছরই বাড়ছে এনবিআরের আদায় লক্ষ্যমাত্রা। 

এতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, ফলে জনসাধারণের জীবনমানের ওপর আরও প্রভাব পড়বে। কারণ মুদ্রাস্ফীতি হলো জনগণের ওপর সরকারের এক ধরনের গোপন ট্যাক্স। তাছাড়া আমদানি বৃদ্ধির ফলে এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও প্রভাব ফেলবে।’ 

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে বলেন, ‘ধনীদের করহার বাড়াতে হবে, তারা যথাযথ কর আদায় করছে না। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনও হ্রাস করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া যেতে পারে।’

এদিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বারবার ব্যর্থতায় এনবিআরের মৌলিক পুনর্গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর। 

তিনি বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি এখন নিয়মিত একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমরা বলছি আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু অপরদিকে দেখা যাচ্ছে সে অনুপাতে রাজস্ব বাড়ছে না। এই সমস্যা চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজন ছিল।’ 

এই ব্যর্থতার প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ‘সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সরকার যথোপযুক্ত ফাইন্যান্সিং করতে পারছে না, ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে দায়ভার বাড়ছে। এ থেকে বের হয়ে আসা সরকারের পক্ষে মুশকিল হবে।’