Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

জবির প্রধান ফটকের সামনে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড, নেপথ্যে চাঁদাবাজি

আরমান হাসান, জবি প্রতিনিধি

আরমান হাসান, জবি প্রতিনিধি

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২, ০৮:৩৮ পিএম


জবির প্রধান ফটকের সামনে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড, নেপথ্যে চাঁদাবাজি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রধান ফটকের সামনে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে বাসস্ট্যান্ড। এতে নিয়মিতই শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনা, শ্লীলতাহানিসহ নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অবৈধ বাসস্ট্যান্ড স্থাপন ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র ও পুলিশের চাঁদাবাজি মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিস্তান থেকে সদরঘাটগামী বাসগুলোর জন্য ধোলাইখালে বাসস্ট্যান্ড স্থাপনের অনুমতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় এবং যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে ধোলাইখালে বাসস্ট্যান্ডটি সরিয়েও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের এবং পুলিশের চাঁদাবাজিতে ভাটা পড়ে।

সেজন্য অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও পুনরায় অবৈধভাবে বাসস্ট্যান্ড জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে নিয়ে আসে চক্রটি। এখন প্রকাশ্যেই চলে চাঁদাবাজি। রাত ১০ টার পর থেকেই তা আরও বাড়তে থাকে।  বাংলাবাজার মোড়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের জায়গায় চাঁদাবাজির অন্যতম আঁখড়া হিসেবে গড়ে তুলেছে তারা। রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, বাস থেকে বিভিন্ন হারে তুলা হয় চাঁদার টাকা। পরিচয়ে সিটি কর্পোরেশনের কথা বলা হলেও এর সাথে সিটি কর্পোরেশনের কোনো সংযোগই নেই বলে জানা যায়।

চাঁদাবাজির এই মহা উৎসবে যোগ দিয়েছে পুলিশও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে থেকেই গভীর রাতে প্রতিটি বাস থেকে ১০০ টাকা হারে চাঁদা তুলে পুলিশ। চাঁদা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানিও করে তারা। প্রতিদিন কর্তব্যরত পুলিশের শিফট পরিবর্তন হলেও একই হারে চলতে থাকে চাঁদাবাজি। পুলিশের চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ও ছবি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলামেরও বেশ কয়েকটি বাস রয়েছে সাভার পরিবহনের ব্যানারে। যেসব দেখাশোনা করেন শরিফুলের কাছের ছোটভাই হিসেবে পরিচিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির এক কর্মকর্তা। সেই প্রভাবেও ঘাঁটি গেড়ে বসেছে এই অবৈধ বাসস্ট্যান্ড।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের কর্মচারী হাসান এর মালিকানায় রয়েছে সাভার পরিবহনের  তিন এর অধিক বাস। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রভাবশালী শিক্ষক ও কর্মকর্তার অংশীদারিত্ব আছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। সেই প্রভাবেই প্রধান ফটক দখল করেই বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়াও ভিক্টরক্লাসিক, বিহঙ্গ, তানজিল, আজমেরি গ্লোরি, বাহাদুর শাহ পরিবহনের রয়েছে একটি বিশাল সিন্ডিকেট। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের সাথে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে এই বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করেছে বলে জানা যায়। কয়েকবছর আগে বাহাদুর শাহ পরিবহনের অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে গিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর পরিবহন শ্রমিকদের হামলার শিকার হোন বলেও জানা যায়।

এদিকে মূল ফটকে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড স্থাপনের ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রাস্তা পারাপারে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন তারা। গত রবিবার মূল ফটককের সামনেই সাভার পরিবহনের এক বাসের ধাক্কায় এক রিকশার আরোহী নিহত হোন। গুরুতর আহত হোন রিকশাচালক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

কিছুদিন পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টরকে বহনকারী এক রিকশাকে ধাক্কা দেয় একটি পরিবহনের বাস। এতে তারা মারাত্মক আহত হোন। এছাড়াও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকেও ধাক্কা দেয় কয়েকটি পরিবহনের বাস। যাতে গুরুতর আহত হয়ে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাও নেন। লাইনম্যান ও হেলপার কর্তৃক নারী শিক্ষার্থী হেনস্থাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তুলার ঘটনাও ঘটে। প্রায় প্রতিনিয়তই পরিবহন শ্রমিকদের হেনস্থার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ডের কারণে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ নম্বর ফটক। ফটকের সামনের পুরো জায়গাটাই অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে সারি সারি বাস। সেজন্য খোলা হয়না সেই ফটকটিও। এতে ভোগান্তি বেড়েছে শিক্ষার্থীদের।

এদিকে অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারে অনেকবার দাবি তুলা হলেও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে গা ছাড়া ভাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তুলা দাবির জবাবে অবৈধ দখলবাজদের পক্ষে সাফাইয়ের সুরে কথা বলেন তারা। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কথা না ভেবে সদরঘাটের যাত্রীদের কথা ভাবেন তারা। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা দূর্ঘটনার শিকার হলেও তা নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই প্রশাসনের।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল বলেন, গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যানবাহনগুলো যাতে চলমান অবস্থায় থাকে।

অবৈধ বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রক্টর বলেন, ‍‍`রায়সাহেব বাজারে গাড়ি ঘুরানোর জায়গা নেই। বাসস্ট্যান্ড যদি মুরগিটোলা হয় তাহলে সদরঘাটের যাত্রীদের আবার গাড়ি ভাড়া দিয়ে যাওয়া আসা করতে হবে।‍‍`

এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ সকালের সময়কে বলেন, ‍‍`এখানে বাসস্ট্যান্ডের কোনো অনুমতি নেই। সাবেক উপাচার্য তার দায়িত্বকালীন প্রশাসনের সহায়তায় এটি ধোলাইখালে স্থানান্তর করেছিলেন। মূলত কিছু প্রভাবশালী চাঁদাবাজ ও কিছু অসাধু পুলিশ চাঁদাবাজি করার জন্যই এখানে বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করেছে। আমিও মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি করতে দেখেছি। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আগে। গত রোববার যে একজন মারা গেলো, আমাদের শিক্ষার্থীদের কেউ দূর্ঘটনার শিকার হলে আন্দোলনে নেমে পড়বে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে। আমি প্রক্টরকে নির্দেশ দিয়েছি ট্রাফিক বিভাগের সাথে কথা বলে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

কেএস

Link copied!