অ্যাগ্রো সিটির পরিকল্পনায় রাজউক

 অ্যাগ্রো সিটির পরিকল্পনায় রাজউক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউজক) ভবন থেকেই শুরু হয় আধুনিক ঢাকার পথচলা। আর ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ নামে পরিকল্পিত পরিবেশ-বান্ধব নগরীর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫৯ সালে শুরু হয় রাজউকের পথচলা। বর্তমানে আধুনিক ঢাকার দৃশ্যমান যে অবয়ব, তারও বাস্তবায়ন হয়েছে রাজউকের পরিকল্পনামাফিক। আধুনিক ঢাকার পর রাজউক এখন গ্রিন (সবুজ) ঢাকা গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আমার সংবাদকে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান সরকারের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী। 

তিনি বলেন, সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে ভবন মালিকদেরও ভবনের পাশে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছি আমরা। ভবনের পাশে খালি জায়গা রাখতে এবং গাছ লাগানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী শহর ছিলো ঢাকা। এরপর ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হয় ওয়ারী, ধানমন্ডি। তৎকালে বিষয়টির দেখভালের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগে ন্যস্ত থাকলেও বর্তমান গুলশান, বনানী, উত্তরার মতো পরিকল্পিত এলাকাগুলোর বাস্তবায়ন হয়েছে রাজউকের মাধ্যমেই। 

শুধু নগর নয়; শিল্প নিয়েও কাজ করছে রাজউক। শ্যামপুর-কদমতলী শিল্প এলাকা, টঙ্গী শিল্প এলাকা ও বাড্ডা পুনর্বাসন এলাকাও রাজউকেরই গড়া। রাজউক যখন ঢাকাকে গড়ে তুলে তখন ঢাকার প্রশাসন ছিলো পৌরসভাভিত্তিক। বর্তমানে দুই সিটি কর্পোরেশন যা করছে, তা একসময় রাজউক করতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাতিরঝিলের কথা। যে হাতিরঝিলের স্বচ্ছ পানিতে নৌকায় করে আসতো বিভিন্ন পণ্য, সেই হাতিরঝিলও একসময় পরিণত হয়েছিল নোংরা ভাগাড়ে। আর এ নোংরা ভাগাড় থেকে হাতিরঝিল আজ পরিণত হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানে। 

চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, হাতিরঝিলের নোংরা পানি অপসারণ কাজ চলছে। যেটা রামপুরা হয়ে নদীতে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও তিনি জানিয়েছেন, অতি শিগগিরই জলকেন্দ্রিক শহর হতে যাচ্ছে ঢাকা। এক্ষেত্রে শহরের ৬৮ ভাগই  থাকবে জল, বাকিটা মাটি। হাতিরঝিলে সমন্বিত এই উন্নয়ন প্রকল্প অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝেও সম্প্রতি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবন মালিকদের পুনর্বাসন ও বিক্রয়ের জন্য ১৫ তলাবিশিষ্ট দুটি ভবনে ১২২টি অ্যাপার্টম্যান্টও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বুঝিয়ে দেয়া হয়। 
 
রাজউক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার্বিক বিবেচনায় হাতিরঝিল প্রকল্পটি রাজউকের একটি সফল প্রকল্প। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছে রাজউক। 

তবে তারা এ-ও বলছেন, এই প্রকল্পের দায়িত্বও একসময় অন্য কোনো সংস্থার হাতে চলে যাবে। একইভাবে সকল প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন শেষে অন্য সংস্থাকে বুঝিয়ে দেয় রাজউক। যেমন কুড়িল ফ্লাইওভার। এ প্রকল্পেরও সফল বাস্তবায়ন শেষে সড়ক বিভাগকে বুঝিয়ে দেয় রাজউক। বর্তমানে ৩০০ ফিটের উন্নয়নকাজ চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ওই অঞ্চলের চেহারাই বদলে যাবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে হচ্ছে পূর্বাচল সিটিও। আধুনিক ঢাকা তথা একটি পরিকল্পিত নগরায়ণের ধারাবাহিকতায় তুরাগ নদের পাশেও একটি পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে রাজউকের। 

রাজউকের চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ঢাকার নিচু ভূমিগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তুরাগের ক্ষেত্রে পানির মাঝেই অনেকটা দ্বীপের আদলে উন্নত শহর গড়ে তুলবো আমরা। অদূর ভবিষ্যতে আমরা কেরানীগঞ্জে একটি কৃষিভিত্তিক শহর করারও পরিকল্পনা নিচ্ছি। সেখান থেকে সবজি-দুগ্ধ ইত্যাদির জোগান আসবে। এক কথায় বলতে গেলে পরিবেশ-বান্ধব শহর বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে রাজউক। পূর্বাচল সিটির বিষয়ে তিনি বলেন, কাজ এখনো শেষ হয়নি; কিন্তু পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কারণেই তা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। শুধু ঢাকা নয়, আশপাশের আরও ৫৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়েও রাজউক কাজ করছে; যাকে আমরা ড্যাপ বা বিশদ নগর পরিকল্পনা বলি। তবে রাজউক যত কাজই করে, সে অনুযায়ী প্রচার না হওয়ায় মানুষ সংস্থাটির সম্পর্কে কম জানে। 

যার কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, এখানে রাজনৈতিক লোক নেই, সবাই আমলা। প্রচার-প্রসারে আমলাদের ঝোঁক কম। ঢাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ উন্নয়নেও বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাজউক। 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পূর্বাচলে ১০০ একর বনায়ন করা হয়েছে। ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লেক তৈরি করা হয়েছে। উত্তরা সিটিতেও লেক আছে। বারিধারা, গুলশান, নিকুঞ্জ, ধানমন্ডি এসব এলাকায়ও লেক আছে। রাজউকের প্রকল্পগুলোতে লেকের দেখা পাবেনই। হাতিরঝিল দেখেন। রাজউক কখনো পরিবেশকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন করে না। আফসোসের কথা হলো, রাজউক কোনো সহযোগিতা পায় না। যেখানে আমরা জনগণের জন্য লেক বানিয়েছি, সেখানে জনগণই সেটাকে দূষণ করছে। কেউ চিপস খেয়ে প্যাকেটটা লেকে ফেলে দিচ্ছে। এসব কি পুলিশ দিয়ে ঠেকানো সম্ভব?

পূর্বাচলসহ ভূমি উন্নয়নে রাজউকের চলমান প্রকল্পগুলোর সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, পূর্বাচলের রাস্তাগুলো হয়ে গেছে। ৬৫টি সেতু হয়েছে। বনায়ন করা হয়েছে। স্কুল করা হয়েছে অনেকগুলো। ১১১ তলা বিল্ডিং হবে। বঙ্গবন্ধু স্কয়ার করবো। শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম করা হবে। টাউনশিপের কাজও চলছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও ১০০ একর জায়গা দেয়া হয়েছে। ভূমি ছাড়পত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের পুরো টিম এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নগরবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, ম্যাজিস্ট্রেট সবাই তাদের জায়গা থেকে এ ব্যাপারে সচেতন। কিন্তু ছাড়পত্রের বিষয়টির সঙ্গে ভূমির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর ভূমির সঙ্গে থাকে নানান জটিলতা। দেশে ক্রেতারা জমি কেনার সময় মালিকানা সঠিকভাবে যাচাই করেন না। এখন আমরা ভূমির ছাড়পত্র চালু করেছি। একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছি, ৪৫ দিনের মধ্যে ভূমির ছাড়পত্রের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।