ঢাকা-ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠতা: পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য কোথায়?

আল–জাজিরা প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৫, ০৩:২২ পিএম
ঢাকা-ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠতা: পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য কোথায়?

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত ২৩ আগস্ট ঢাকায় পৌঁছান। ১৩ বছরের মধ্যে এটাই প্রথমবারের মতো কোনো শীর্ষ পাকিস্তানি কূটনীতিকের বাংলাদেশ সফর। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও নতুন অধ্যায় সূচনাই ছিল তাঁর এ সফরের মূল লক্ষ্য।

বিমানবন্দরে পৌঁছে ইসহাক দার সফরকে “ঐতিহাসিক” অভিহিত করেন। 

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, করাচি থেকে চট্টগ্রাম, কোয়েটা থেকে রাজশাহী, পেশোয়ার থেকে সিলেট এবং লাহোর থেকে ঢাকা—দুই দেশের তরুণেরা যৌথভাবে ভবিষ্যৎ গড়বে।

সম্পর্কের দ্রুত উষ্ণতা

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের একাধিক বৈঠক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এ সময় দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সফর ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সেনা ও নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইসলামাবাদ সফর করেছেন, আবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঢাকায় এসেছেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি

চীনে নিয়োজিত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ সতর্ক করে বলেন, অতীতের জটিলতা ও আস্থার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। তবে গঠনমূলক সংলাপের কাঠামো গড়ে তুললে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, পাকিস্তান কৌশলগত কারণে দ্রুত সম্পর্ক জোরদার করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল বরাবরই ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব-প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বন্দ্বে প্রভাবিত হয়েছে।

ভারত ও চীনের প্রভাব

ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও মে মাসের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে জটিলতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় বিবেচনা করছে।

বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখনো খুব ছোট। ২০২৪ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশে ৬৬১ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রপ্তানি করেছে মাত্র ৫৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।

অধ্যাপক দেলোয়ার মনে করেন, তুলা, চাল, সিমেন্ট ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে; অন্যদিকে পাকিস্তান পাট, রাসায়নিক ও তামাকজাত পণ্যের বাজার পেতে পারে।

ঐতিহাসিক ক্ষত

তবে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। তখনকার হত্যাযজ্ঞের জন্য বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমার দাবি জানায়। পাশাপাশি উর্দুভাষী নাগরিকদের মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভাগ ও ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী অনুদান–সংক্রান্ত ইস্যুগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। 
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব আইজাজ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণ অতীতের যন্ত্রণা কাটিয়ে সামনে এগোতে চান। অধ্যাপক দেলোয়ারের মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বাংলাদেশের মনোজগতে অটুট থাকলেও কূটনীতি এক গতিশীল প্রক্রিয়া—যেখানে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগোনো সম্ভব।

নির্বাচনের আগে কৌশল

ঢাকা সফরে ইসহাক দার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

উল্লেখ্য, ইসহাক দারের ঢাকা সফরকে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত ও ঐতিহাসিক আস্থার সংকট দূর না হলে এ সম্পর্কের পূর্ণতা অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইএইচ