জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রশাসনে আবারও বড় ধরনের রদবদল আনল অন্তর্বর্তী সরকার। মাত্র একদিনের ব্যবধানে আরও ১৪টি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনের কাঠামোকে দ্রুত, দক্ষ ও নির্বাচনের উপযোগী করতে এই রদবদল আনা হয়েছে। এর ফলে গত দুই দিনে মোট ২৯টি জেলায় ডিসি বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হলো যা এবারের নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শারমিন আক্তার জাহান নড়াইল থেকে বদলি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি হয়েছেন। মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ, পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক ছিলেন, এখন ঝিনাইদহের ডিসি। ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম মেহেরপুর থেকে গিয়ে নড়াইলের ডিসি হয়েছেন। মোহাম্মদ ইউসুপ আলী, খুলনার জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার ছিলেন, নিয়োগ পেয়েছেন জামালপুরে। লুৎফুন নাহার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে হয়েছেন মেহেরপুরের ডিসি। মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে এখন কিশোরগঞ্জের ডিসি। মো. মমিন উদ্দিন, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক থেকে গেছেন ঝালকাঠিতে। মো. আরিফ-উজ-জামান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, এখন গোপালগঞ্জের ডিসি। মোহাম্মদ কামাল হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব, হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার ডিসি। কাজী মো. সায়েমুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, নিয়োগ পেয়েছেন পঞ্চগড়ে। মো. আল-মামুন মিয়া, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক (উপসচিব), হয়েছেন জয়পুরহাটের ডিসি। মো. সাইফুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, গেছেন ময়মনসিংহে। নাজমুন আরা সুলতানা, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক, হয়েছেন মানিকগঞ্জের ডিসি। মো. নাজমুল ইসলাম সরকার, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক, পেয়েছেন চাঁদপুরের ডিসির দায়িত্ব।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে,জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে শনিবার (৮ নভেম্বর) মধ্যরাতে আরও ১৫টি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয় সরকার। টানা দুই দিনে এই রদবদলকে নির্বাচনপূর্ব প্রশাসনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আগামী নির্বাচনে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে মাঠপর্যায়ে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ডিসি বদলির এ ধারা সরকারের জন্য দ্বিমুখী বার্তা বহন করছে। একদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ইঙ্গিত, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রচেষ্টা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, প্রশাসনিক বদলি নির্বাচনের আগে সব সময়ই হয়। তবে এবার বদলির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এটি নির্বাচনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত যেমন দেয়, তেমনি মাঠ প্রশাসনের প্রতি সরকারের আস্থার পুনর্বিন্যাসও বোঝায়।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জেলা প্রশাসকরা থাকবেন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে। তাই তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনোনয়ন যাচাই, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়সহ প্রতিটি ধাপে ডিসিরা মূল দায়িত্বে থাকবেন।
একজন সাবেক সিনিয়র সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিসিদের পদ পরিবর্তন মানেই পুরো জেলার প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা বদলে যাওয়া। নির্বাচনের আগে এরকম বড় রদবদল সরকারের কৌশলগত প্রস্তুতিরই অংশ।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা বারবার বলেছেন জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত সময় ফেব্রুয়ারিতেই হবে। কেউ চাইলে বা না চাইলে নির্বাচন ঠেকানো কারও সাধ্য নেই।
জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একযোগে মাঠ প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ডিসিদের পাশাপাশি পুলিশ সুপার (এসপি) পর্যায়েও শিগগির পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের প্রশাসন এখন নির্বাচনী তাপমাত্রায় দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে। একদিকে জেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্ব, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত প্রস্তুতি সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগাম চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে বিরোধী দলগুলো প্রশাসনিক বদলিকে নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের প্রস্তুতি বলে সমালোচনা করছে। ফলাফল যা-ই হোক, সরকারের এই প্রশাসনিক ঝড় এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন