রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় হিসাবরক্ষক নাজমুল হক হত্যাকাণ্ডের কিনারা করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় এই খুনের সঙ্গে জড়িত ৫ তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিছক বেড়াতে যাওয়ার টাকার প্রয়োজনে এই ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- আলিফ হোসেন, মো. সিফাত হোসেন, মো. সাকিব আল হাসান, রাইয়ান ও মো. নয়ন প্রামাণিক। গতকাল বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা ও টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে পরিচয়ের সূত্রপাত তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, নাজমুল হকের সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত আলিফ হোসেনের পরিচয় হয় একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। সেই পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে আলিফের মাধ্যমেই বাকি চারজন সিফাত, সাকিব, রাইয়ান ও নয়নের সঙ্গে নাজমুলের জানাশোনা হয়। নাজমুল বাড্ডার একটি ভাড়া বাসায় সপরিবারে থাকতেন। তবে মাঝেমধ্যে যখন তার স্ত্রী ও সন্তান গ্রামের বাড়ি বরিশালে বেড়াতে যেতেন, তখন এই তরুণরা নাজমুলের বাসায় যাতায়াত করতেন।
হত্যার লোমহর্ষক পরিকল্পনা তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী নাসিরুল আমীন জানান, অভিযুক্ত সিফাত ও সাকিব কয়েকদিন আগে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ভ্রমণের খরচ মেটানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা তাদের কাছে ছিল না। তখনই তারা নাজমুলকে লক্ষ্য করেন এবং তার কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেওয়ার ছক আঁকেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৯ ডিসেম্বর তারা একটি নতুন ধারালো ছুরি কেনেন। ওই দিন নাজমুলের স্ত্রী ও সন্তান গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেদীগঞ্জে থাকায় বাসায় তিনি একাই ছিলেন।
হত্যাকাণ্ড যেভাবে সংঘটিত হয় পুলিশের ভাষ্যমতে, ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সিফাত পূর্বপরিকল্পিতভাবে কেনা ছুরিটি নিয়ে নাজমুলের বাসায় যান। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি সুযোগ বুঝে ছুরিটি নাজমুলের খাটের তোশকের নিচে লুকিয়ে রাখেন। এরপর রাত গভীর হলে নাজমুল যখন অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিলেন, তখন সিফাত তোশকের নিচ থেকে ছুরি বের করে তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর সিফাত বাসা থেকে নাজমুলের ব্যবহৃত দুটি স্যামসাং মোবাইল ফোন, একটি টেলিভিশন ও মানিব্যাগ নিয়ে চম্পট দেন। মামলার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অন্য আসামিরা দাবি করেছেন, সিফাত একাই ঘরের ভেতর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন এবং বাকিরা বাসার বাইরে পাহারায় ছিলেন।
সূত্রহীন মামলা যেভাবে শনাক্ত হলো গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের মামা মো. ফারুকুল ইসলাম বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নাজমুলের বাসায় ওই তরুণদের যাতায়াতের প্রমাণ পায়।
পরবর্তীতে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে টঙ্গীর বোর্ড বাজার এলাকা থেকে প্রথমে সিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিফাতের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর মগবাজারে অভিযান চালিয়ে সাকিব, রাইয়ান ও নয়নকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবশেষে এই চক্রের মূল যোগসূত্র আলিফ হোসেনকেও জালে তোলে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত টেলিভিশন ও একটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে আসামিরা ঘটনার পরপরই ওই বিশেষ অ্যাপ থেকে তাদের নিবন্ধন মুছে ফেলেছিল।
শোকাতুর পরিবার ও বিচার প্রার্থনা নিহত নাজমুল হক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামান্য কিছু টাকার জন্য এভাবে একজন মানুষকে প্রাণ দিতে হবে, তা মানতে পারছেন না প্রতিবেশী ও স্বজনরা। নাজমুলের স্ত্রী ও সন্তান গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এসে এখন বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী নাসিরুল আমীন জানান, আসামিদের আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ড আবেদন করা হবে যাতে এই ঘটনার নেপথ্যে আরও কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অপরিচিত মানুষের সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অ্যাপের মাধ্যমে পরিচয় এবং তাদের ব্যক্তিগত পরিসরে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন