একটি প্লাস্টিকের পুতুল আর কিছু খেলনা ফুল- পাঁচ বছর বয়সী ছোট্ট আরিফার জন্য এইটুকুই ছিল পৃথিবীর সব আনন্দ। কিন্তু বড় ভাইয়ের দেওয়া সেই সামান্য উপহারই যে তার অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা ভাবতেও পারেনি কেউ। রাজধানীর ভাটারা থানাধীন কুড়িল মৃধাবাড়ি এলাকায় মাত্র ১৬ বছর বয়সী ভাবির হাতে শ্বাসরোধে প্রাণ হারিয়েছে শিশু আরিফা। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে একটি শ্রমজীবী পরিবারের সব স্বপ্ন।
নিহত আরিফা শরীয়তপুরের ডামুড্ডা উপজেলার সিদুলকুড়া গ্রামের দিনমজুর রাজিব ও হাবেজা বেগম দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট এবং সবার আদরের। কয়েকদিন আগেই তাকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। নতুন বই আর স্কুল ড্রেস নিয়ে আরিফার চোখে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
পরিবারটি কুড়িল মৃধাবাড়ি এলাকার জহিরের বাড়িতে ভাড়া থাকতো। পরিবারের বড় ছেলে হাসানের স্ত্রী ১৬ বছর বয়সী খাদিজা আক্তার। পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের পর থেকেই ননদ আরিফাকে সহ্য করতে পারতো না খাদিজা। স্বামী হাসান তার ছোট বোন আরিফার জন্য বাইরে থেকে কোনো খাবার বা খেলনা নিয়ে এলে তা নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো হাসান ও খাদিজার মধ্যে।
হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে (মঙ্গলবার) বড় ভাই হাসান বাড়িতে ফেরার সময় বোন আরিফার জন্য একটি প্লাস্টিকের পুতুল আর ফুল নিয়ে আসেন। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর রাত পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রচণ্ড কথা-কাটাকাটি হয়। খাদিজার অভিযোগ ছিল, তার চেয়ে আরিফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই ক্ষোভ থেকেই পরদিন সকালে এক ভয়াবহ পরিকল্পনা সাজায় খাদিজা।
বুধবার সকালে যখন পরিবারের সবাই (বাবা, মা ও ভাই) নিজেদের কর্মস্থলে চলে যান, তখন বাড়িতে আরিফার সাথে একা ছিল ভাবি খাদিজা। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সুযোগ বুঝে খাদিজা শিশু আরিফাকে রুমের ভেতর ডেকে নেয়। এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোট্ট শিশুটির গলা টিপে ধরে সে। প্রায় ৩ থেকে ৪ মিনিট টানা শ্বাসরোধ করে রাখার ফলে এক পর্যায়ে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর খাদিজা নিজে কোলে করে আরিফার মরদেহ ঘরের পাশে থাকা পানির ট্যাংকে ফেলে দেয়। এরপর সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরে ফিরে আসে যেন কিছুই ঘটেনি।
ঘটনার মাত্র ১০-১৫ মিনিট পর আরিফার মা কাজ থেকে বাসায় ফেরেন। মেয়েকে দেখতে না পেয়ে তিনি পাগলের মতো আশেপাশে খুঁজতে থাকেন। দুপুর পর্যন্ত কোনো হদিস না পেয়ে বাড়ির পাশের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, আরিফা সকালের পর আর বাড়ি থেকে বের হয়নি। তখনই পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয় যে শিশুটি বাড়ির ভেতরেই কোথাও আছে। নিবিড় তল্লাশির এক পর্যায়ে পানির ট্যাংকের ভেতর ভাসমান অবস্থায় আরিফার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যদের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে ঘাতক ভাবি খাদিজা আক্তার। সে নিজে এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। খবর পেয়ে ভাটারা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং খাদিজাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মওদুদ কামাল জানান, আরিফার গলায় শ্বাসরোধের স্পষ্ট দাগ এবং ঠোঁটে ফোলা জখম পাওয়া গেছে। স্রেফ ইর্ষা ও তুচ্ছ পারিবারিক ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। খাদিজা একাই এই কাজ করেছে বলে স্বীকার করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে শিশু আরিফার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ঘাতক ভাবি খাদিজা আক্তারকে আজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।
নিহত আরিফার বাবা-মা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। যে পুতুলের জন্য তাদের মেয়েকে প্রাণ দিতে হলো, সেই পুতুলটি এখন পড়ে আছে ঘরের কোণে, কিন্তু সেটি নিয়ে খেলার জন্য আরিফা আর নেই।
কুড়িলের এই ঘটনা আমাদের সমাজের পারিবারিক শিক্ষা ও সহনশীলতার অভাবকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী বধূর মনে এতটুকু ঘৃণা কীভাবে জমা হলো যে সে একটি অবোধ শিশুকে হত্যা করতে দ্বিধা করল না, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবার অবকাশ রয়েছে। তুচ্ছ উপহারের বিনিময়ে একটি তাজা প্রাণের বিনাশ আমাদের অপরাধ প্রবণতার ভয়াবহতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন