রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকার ‘শারমিন একাডেমি’ নামের একটি স্কুলে চার বছরের কম বয়সী এক শিশুকে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়া গ্রেপ্তার হয়েছেন। আজ শুক্রবার ভোরে মিরপুর এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পল্টন থানা পুলিশ। পবিত্র কুমার ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষিকা শারমিন জাহানের স্বামী।
পল্টন থানা পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটির ওপর পবিত্র কুমারের অমানুষিক নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়ার পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। তবে এ মামলার অপর আসামি প্রধান শিক্ষিকা শারমিন জাহান এখনো পলাতক রয়েছেন।
গত ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টন মসজিদ রোডের শারমিন একাডেমিতে এ পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে। স্কুলের প্রি প্লে শ্রেণিতে পড়া শিশুটিকে তুচ্ছ কারণে স্কুলের অফিস কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষিকা শারমিন জাহান শিশুটিকে ধরে রাখছেন এবং প্রথমে একটি চড় মারেন। এরপর ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়া শিশুটির ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি কখনো শিশুটির গলা চিপে ধরছিলেন, কখনো মুখ চেপে ধরছিলেন।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, পবিত্র কুমারের হাতে একটি স্ট্যাপলার ছিল, যা দিয়ে তিনি শিশুটিকে ভয় দেখাচ্ছিলেন। নির্যাতনের একপর্যায়ে ভীতসন্ত্রস্ত শিশুটি প্রধান শিক্ষিকার শাড়িতে থুতু ফেললে, পবিত্র কুমার শিশুটির মাথা জোরপূর্বক সেই থুতুর জায়গায় চেপে ধরেন এবং বারবার মাথায় ঝাঁকি দিতে থাকেন। শিশুটি বাঁচার জন্য ছটফট করলেও সেখানে উপস্থিত থাকা প্রধান শিক্ষিকা বা ব্যবস্থাপক, কারও মনেই নূন্যতম দয়া লক্ষ্য করা যায়নি।
নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা পল্টন থানায় শিশু আইনের ৭০ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার বিবরণে তিনি উল্লেখ করেছেন, এ ঘটনার পর থেকে শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ঘুমের মধ্যেও সে আঁতকে উঠছে এবং আর্তনাদ করে বলছে, আমার মুখ সিলি (সেলাই) করে দিও না। অভিযুক্ত পবিত্র কুমার স্ট্যাপলার দেখিয়ে শিশুটির মুখ সেলাই করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পবিত্র কুমারকে ধরা হয়েছে।
মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, "এ ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দুঃখজনক। সিসিটিভি ফুটেজে নির্যাতনের প্রমাণ স্পষ্ট। আমরা প্রধান আসামি পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করেছি। তার স্ত্রী এবং মামলার দ্বিতীয় আসামি শারমিন জাহানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে। অপরাধী যে ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।"
নয়াপল্টনের মতো একটি ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত এ স্কুলে শিশুদের নিরাপত্তার এমন বেহাল দশা দেখে অভিভাবক মহলে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ছোট শিশুদের পাঠদানের নামে যারা এমন দানবীয় আচরণ করে, তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। শারমিন একাডেমির মতো নামসর্বস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স এবং সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যাচাই করার দাবিও তুলেছেন অনেকে।
শিশু আইন ২০১৩ এর ৭০ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধারায় অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ এ মামলায় শক্তিশালী সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করবে এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন