বিজয়নগরের ঐতিহ্যবাহী আখের গুড়

বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২২, ০৬:৫৫ পিএম
বিজয়নগরের ঐতিহ্যবাহী আখের গুড়

গরমকালে আমাদের দেশে রাস্তার পাশে আখের রস বিক্রি করা অতি পরিচিত দৃশ্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হলেও রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বড় বড় কর্তাব্যক্তিরাও এর ক্রেতা। নিজে পান করার পাশাপাশি অনেকে বোতলে ভরে পরিবারের সদস্যদের জন্যও নিয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয়নগর উপজেলা আখের জন্য মোটামুটি বিখ্যাত। এখানে বহু আগে থেকেই আখের রস থেকে গুড় বানানো হয়। বিশেষ করে বিষ্ণুপুর, সিঙ্গারবিল, পাহাড়পুরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইক্ষুর চাষ হয়।

সময়ের ব্যবধানে এখন অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেখানে ৬০-৭০ বাড়িতে গুড় তৈরি হতো এই সংখ্যা এখন মাত্র ৭-৮ এ নেমে এসেছে। বিষ্ণুপুর গ্রামের আখ চাষি রাসেল মিয়ার নিজের লাগানো ১৫ বিঘার সাথে ক্রয় করা ৫ বিঘা মিলিয়ে মোট ২০ বিঘা জমি রয়েছে। আগামী ৩ মাস গুড় বানিয়ে বিক্রি করবে। কয়েক লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন সে। গুড় সাধারণত ৩ প্রকার; ঝোলাগুড়, পাটালিগুড়, চিটাগুড়। এখানকার গুড় আগে যেভাবে তৈরি করা হতো এখনো সেভাবেই পুরাতন পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। লম্বা বাঁশ বা সাইজমতো গাছের ডাল আখের মেশিনে লাগিয়ে গরু-মহিষের কাঁধে রেখে চোখ বেঁধে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রস বের করা হয়।

প্রায় ২৫ বছর ধরে আখ তৈরির সাথে যুক্ত রুক্কু মিয়া বলেন, ১ লাখ দিয়া বইশ (মহিষ) কিনছি এইবার। এই বইশেরে আড়াই থাইক্যা তিনঘন্টা পর্যন্ত ঘুরান লাগে, আবার এক লাগারে তিনঘণ্টা চুলাত জ্বাল দেয়ন লাগে।

অর্থাৎ রস বের করা আর চুলায় রাখা মিলিয়ে ৬ঘন্টা পর তৈরি হয় গুড়। ৬০-৬৫ লিটার রস থেকে ৪০-৪২ কেজি গুড় হয়ে থাকে। এখানে প্রতি কেজি লালী (ঝোলাগুড়) ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। যা গতবছর ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হতো। কাঁচা রস ৫০ টাকা লিটার বিক্রি হয়। চাহিদা প্রচুর থাকায় বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। বাড়িতেই সব বিক্রি হয়ে যায়। কোনোরকম ভেজাল না থাকায় দূর থেকে মানুষজন এসে কিনে নিয়ে যায়। পাশাপাশি কিভাবে পুরাতন পদ্ধতিতে গুড় তৈরি হয় তা দেখে উপভোগ করেন।

গুড় প্রস্তুতকারী জনাবালীর কাছ থেকে জানা যায়, আগে মহিষের চেয়ে গরুর ব্যবহার বেশি ছিল। তাছাড়া শুকনো গুড় বানানো হতো বেশি, তরল বা ঝোলাগুড় খুব একটা তৈরি করা হতো না। গত ৫-৭ বছর ধরে ঝোলাগুড় তৈরি হচ্ছে বেশি।

বিজয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ এই প্রতিবেদককে জানান, বিজয়নগরে প্রায় ১৮০-২০০ বিঘার মতো আখের জমি রয়েছে। তবে এর বেশিরভাগই বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে। পাহাড়পুরসহ অন্যান্য এলাকায় কিছু আছে। এখানে আখের কোটি টাকার বাজারমূল্য রয়েছে। নতুন জাত নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। কিছুদিন আগে আমাদের এখান থেকে ইশ্বরদী সুগার রিসার্চ  ইন্সটিটিউটে দু‍‍`জন ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। আমরা আখ চাষিদের সহযোগিতা করতে সবরকম সহযোগিতা করব।

বিজয়নগর কাজী সফিকুল ইসলাম কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক এনামুল কবির সুমন আখ সম্পর্কে বলেন, আখ বা ইক্ষু, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Saccharum officinarum. এটি একটি Poaceae গোত্রের সপুষ্পক বর্ষজীবী উদ্ভিদ। গ্রীষ্ম প্রধান রৌদ্রময় উষ্ণ আবহাওয়ায় আদ্র মাটিতে আখ সবচেয়ে ভাল জন্মে।

স্থানীয়ভাবে এখানে আখকে কুইশার বা কুইয়ার বলা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র পোকামাকড়ের কারণেই প্রতি বছর গড়ে ২০% উৎপাদন ও ১৫% আহরণ হ্রাস পায়। আমাদের দেশে এপর্যন্ত আখের ৭০টি পোকামাকড় শনাক্ত করা গেছে।

উপ-সহকারি কৃষি অফিসার মো. আ. ওয়াদুদ বলেন, আখের রোগবালাই এবং ফলনের বিষয়ে আমরা কৃষকদের সবসময় পরামর্শ দিয়ে থাকি। বছরে ১২৫০-১৫০০ মি.লি বৃষ্টিপাত হলে বাড়তি সেচের প্রয়োজন হয় না।

আখ বাঁশ ও ঘাসের জাত ভাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, আম হইতে আঁটি পর্যন্ত কোনো অংশই ফেলনা নয়। যার অর্থ হচ্ছে প্রভুর দানের সবটুকুই কাজের। ইক্ষু বা আখের ক্ষেত্রে এটি বেশ প্রযোজ্য। কিছুদিন আগেও আখের ছোবড়া বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া বা পুড়িয়ে দেয়ার বিকল্প ছিল না। রস বের করে বাকি থাকা আখের ছোবড়া পর্যন্ত এখন আর ফেলনার বস্তু নয়। আখের আঁশ থেকে তৈরি ফেব্রিকগুলো পোশাক তৈরিতে সুবিধাজনক বিধায় এর মিশ্রণে সেরা মানের পোষাক তৈরি করা হয়ে থাকে। টেক্সটাইল শিল্পে উদ্ভাবনী ধারণা বাড়ায় বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পে এর চাহিদা বেড়ে চলেছে।

কেএস