৫০ বছর ধরে সুগন্ধা নদীতে ভাঙন, নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা

আরিফ সরদার, নলছিটি: প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৫, ০৫:৫৯ পিএম
৫০ বছর ধরে সুগন্ধা নদীতে ভাঙন, নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা

‘আমার স্বামীর একটা বাড়ি ছিলো, সেটি নদীতে চলে গেছে অনেক আগেই। পরে একটু দূরে আরেকটা বাড়ি করছিলো, আমার ছেলেরা সেটিও ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। 

এছাড়া আমাদের শেষ সম্বলগুলোও সুগন্ধা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি আমার স্বামীর কবরটিও নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে আমরা অন্যের জমিতে কিছুটা ঘর তুলেছি। আমাদের কেউ কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। আমরা খুবই অসহায় হয়ে পড়েছি।’ —– এসব কথা বলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের নদীর তীরের বাসিন্দা মাকসুদা বেগম (৭০)।

একই এলাকার রশিদ মোল্লা (৫০) জানান, প্রায় ৫০ বছর ধরে নদী ভাঙন চলছেই, এখনও পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শত শত পরিবার তাদের বসতঘর, গাছপালা, পানের বরজসহ কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হারিয়েছে।

সুগন্ধা নদীর ভাঙনে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীপারের ১০টিরও বেশি গ্রামে তীব্র ভাঙনে শত শত পরিবার দিশেহারা। দফায় দফায় বাড়ি ছেড়েও রক্ষা পাচ্ছে না কেউ। বর্ষাকালে নদীপারের মানুষ দিন কাটায় শঙ্কায়।

স্থানীয়রা জানান, সুগন্ধা নদীর ভাঙনে শতাধিক পরিবার তাদের মাথা গোঁজার শেষ সম্বল ও ভিটেমাটি হারিয়েছে। এক সময়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নদীর ভয়াল গ্রাসে সব হারিয়ে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। জেলার তিমিরকাঠি, দরিরচর, খোজাখালী, মল্লিকপুর, সিকদারপাড়া, বহরমপুর, ষাটপাকিয়া, কাঠিপাড়া, অনুরাগসহ বেশ কিছু গ্রামের বড় অংশ নদীর পেটে গেছে। এর মধ্যে খোজাখালী, দরিরচর, তিমিরকাঠি ও সিকদারপাড়ার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি।

হেপী বেগম (৩৮) বলেন, ‘নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন ঘরের সঙ্গে এসে পড়েছে। আমরা খুবই আতঙ্কিত, ছেলে-মেয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। কোথায় যাবো, কী করবো বুঝতে পারছি না।’

মগড় ইউনিয়নের কাঠিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইউসুফ হাওলাদার (৭০) বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে ২০-৩০টা বসতবাড়ি ছিল, এখন নদীতে মাত্র ২-৩টি পরিবার রয়ে গেছে। আমরা কিছুই চাই না, শুধু নদী ভাঙ্গন রোধ করলেই হবে।’

কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের বাসিন্দা জামাল ফকির বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার বাড়ি সুগন্ধা নদীর মাঝখানে ছিল। এখন নতুন করে অর্থ জমিয়ে বাড়ি করেছি। এতো বছর ধরে ভাঙন হচ্ছে, কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

অবসরপ্রাপ্ত তহসিলদার হাজী আব্দুল হক তালুকদার বলেন, ‘যে জায়গায় বহু বসতঘর ছিল, এখন সেখানে লঞ্চ চলাচল করে। নদী আমার বাড়ির কাছে চলে আসছে। হয়তো ভবিষ্যতে নিজ ভিটায় থাকা আমার সম্ভব হবে না।’

সরই গ্রামের ইউপি সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ভাঙনকূলে থাকা আমার অনেক স্বজনেরা তাদের বাপ-দাদার বাড়ির কোনো চিহ্ন রাখতে পারেনি। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো সুরাহা পাইনি।’

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা জানান, ঝালকাঠি ও নলছিটির ভাঙন এলাকা নিয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। অন্যান্য ভাঙন স্থানের জন্য প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদিত হলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইএইচ