সংকটে কর্মহীন ১ লাখ ১২ হাজার তাঁতশ্রমিক

ভারত-বাংলাদেশ টানাপোড়েনে ধস: বিপর্যয়ে শাহজাদপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প

জহুরুল ইসলাম, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৫, ০২:৫৪ পিএম
ভারত-বাংলাদেশ টানাপোড়েনে ধস: বিপর্যয়ে শাহজাদপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ কাপড়ের হাট শাহজাদপুর। মোঘল আমলে শুরু হওয়া এই তাঁতশিল্প একসময় জীবিকার অন্যতম নির্ভরযোগ্য খাত হিসেবে গড়ে উঠেছিল। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শুধু শাহজাদপুরেই হাতে চালিত তাঁতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজারে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, বাণিজ্যিক কৌশল ও নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫০ হাজার তাঁত। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার তাঁতশ্রমিক।

প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে বিপুল পরিমাণ দেশীয় তাঁতবস্ত্র—শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা—ভারতে রপ্তানি হতো। কিন্তু সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়া অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (সাপটা) বাতিল, ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নানা প্রতিবন্ধকতায় এই শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়েছে।

শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে গিয়ে দেখা যায়, ভারতীয় পাইকারদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। গত বছর এ সময়ে যেখানে প্রতিজন ব্যবসায়ী ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার জোড়া শাড়ি কিনতেন, এবার তা শতকরা ৭০ ভাগ কমেছে। ফলে হাটে বেচাকেনায় ধস নেমেছে।

তাঁতীরা জানান, ঈদুল ফিতরের পর দুর্গাপূজা মৌসুমই ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানির সময়। এ সময়ে ভারতে রাজশাহী সিল্ক, কাতান, জামদানী, বেনারসি, চোষা, ব্লক ও চুমকি কাজ করা শাড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকে। 

বিশেষত ভারতীয় নারীরা বাংলাদেশের সিল্ক ও জামদানীর প্রতি বেশি আগ্রহী। কিন্তু রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় এবার তাঁতীরা মারাত্মক লোকসানে পড়েছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পরপর কয়েক দফা বন্যা, করোনার প্রভাব, হ্যান্ডলুমের স্থলে পাওয়ারলুমের প্রচলন এবং সর্বশেষ ভারতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া শাহজাদপুরের তাঁতশিল্পকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফলে তাঁতশ্রমিকরা পরিবার চালানো ও ঋণ শোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাহমুদ বলেন, “হাটে বেচাকেনা নেই, শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া যাচ্ছে না। লাখো তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। এখনই সরকারি সহযোগিতা না এলে শিল্পটি টিকে থাকা কঠিন।”

বাংলাদেশ স্পেশালাইজড টেক্সটাইল অ্যান্ড পাওয়ারলুম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসটিএমপিআইএ) সহ-সভাপতি আবু হাসান খান মনি ও কেন্দ্রীয় তাঁতী নেতা মুক্তিযোদ্ধা হায়দায় আলী বলেন, “ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে দেশের সর্ববৃহৎ কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।”

শাহজাদপুর হাটের ইজারাদার নাদিম আলীও আশা প্রকাশ করেন, ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি উদ্যোগ নেবে।

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও রপ্তানি সংকটে শাহজাদপুরের তাঁতশিল্প বড় বিপর্যয়ে পড়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ১ লাখেরও বেশি তাঁতশ্রমিক। তাঁতীরা বলছেন, ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই।

ইএইচ