প্রাথমিক শিক্ষা

শিক্ষক আছে, ছাত্র নেই অনিয়মে ভর ৫০৩ বিদ্যালয়

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৫, ১১:৫০ এএম
শিক্ষক আছে, ছাত্র নেই অনিয়মে ভর ৫০৩ বিদ্যালয়

মাগুরা জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০৩টি। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা- শিক্ষক আছে, ছাত্র নেই; পদ আছে, মানুষ নেই; নিয়ম আছে, প্রয়োগ নেই। প্রাথমিক শিক্ষার এই সংকট এখন জেলার সর্বত্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বা পদায়ন না হওয়ায় সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে বহু বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদও খালি থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সহকারী শিক্ষক জয়ন্ত কুমার বলেন, একজন শিক্ষককে এখন পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ ও পরিসংখ্যান প্রস্তুত-সব একসঙ্গে সামলাতে হয়। এতে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মোহাম্মদপুর উপজেলার চরজোকা ও চরদেউড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন, অথচ শিক্ষক রয়েছেন ছয়জন। শ্রীপুর উপজেলার গোয়াইলবাড়ি, কালীনগর ও সরদার কালীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ থেকে ৭৭ জনের মধ্যে, কিন্তু শিক্ষক আছেন পাঁচ থেকে ছয়জন।

শ্রীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুর রশিদ বলেন, কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে ঠিকই, তবে আমরা উপস্থিতি ও শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছি।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ক্লাস চালু থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সকাল ৯টার আগে ক্লাস শুরু হয় না এবং বিকেল ৪টার আগেই ছুটি দেওয়া হয়।

অভিভাবক মোছা. জোহরা খাতুন বলেন, আমার সন্তান সপ্তাহে তিনদিন স্কুলে যায়, কিন্তু হাজিরা খাতায় দেখা যায় প্রতিদিন উপস্থিত!

পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক সভা বা প্রশিক্ষণের অজুহাতে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন, কিন্তু আর ফেরেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বিনা শিক্ষায় বাড়ি ফিরে যায়।

জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ ক্লাস: মাগুরা সদর উপজেলার ধলহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের দেয়াল ও ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, ইট খুলে রড বেরিয়ে এসেছে। শিশুরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে ক্লাস করছে।

অভিভাবক আব্দুর রশিদ বলেন, প্রতিদিন মনে হয় সন্তানকে যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছি।

মাগুরা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাইফুজ্জামান জানান, ১৮৩টি বিদ্যালয়ে ২৩ হাজার ৫০৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ধলহরা বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

কোচিংয়ের ব্যবসায় শিক্ষক, ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্কুল: জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়ের পাশে গড়ে উঠেছে কেজি স্কুল, এনজিও পরিচালিত স্কুল ও ভূঁইফোড় শিক্ষাকেন্দ্র। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এসব প্রতিষ্ঠানে ক্লাস নিচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীভেদে টাকা নিচ্ছেন।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ মো. মফিজুর রহমান বলেন, সরকারি শিক্ষক যদি পাশের কোচিংয়ে পড়ান, তাহলে সরকারি স্কুলে কে পড়াবে? ফলে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে, আর শিক্ষকরা অনিয়মের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন।

প্রশাসনিক দুর্বলতা ও মনিটরিং সংকট: দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। শূন্য পদ ও বদলির বিলম্বে কার্যক্রম ব্যাহত। শিক্ষক বণ্টনে অসামঞ্জস্য: কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক বেশি, শহরমুখী বিদ্যালয়ে কম। মনিটরিং দুর্বলতা: হাজিরা খাতা জালিয়াতি ও ক্লাস অনিয়ম। অভিভাবকের উদাসীনতা: কোচিং সংস্কৃতি ও কেজি স্কুলে আকর্ষণ বৃদ্ধি। ফলে জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে।

সমাধান কোথায়: মাগুরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক নিয়োগ ও বদলির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। উপস্থিতি মনিটরিং এবং বিদ্যালয় একীভূতকরণ নিয়ে কাজ চলছে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য, কঠোর মনিটরিং এবং কোচিং নির্ভরতা বন্ধে আইন প্রয়োগ এই পদক্ষেপগুলো এখনই জরুরি।

সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা ভেঙে পড়লে একটি প্রজন্মের মেধাই ভেঙে পড়ে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে মাগুরার শিক্ষার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

জেএইচআর