আজ ১৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশে বিজয় অর্জিত হলেও বিজয় দেখেনি কিশোরগঞ্জের মানুষ। ওই দিন সারাদেশের মানুষ বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলেও কিশোরগঞ্জের মানুষ বঞ্চিত ছিল সেই আনন্দ থেকে। সেদিনও কিশোরগঞ্জের আকাশে উড়ছিল পাকিস্তানের পতাকা, হানাদার বাহিনীর দোসরদের সঙ্গে চলেছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুরো সময় জুড়ে কিশোরগঞ্জ ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের শক্ত ঘাঁটি। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর সর্বপ্রথম ১৯ এপ্রিল শুক্রবার ট্রেনে করে হানাদার বাহিনী প্রথম কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করে। ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী কিশোরগঞ্জ ছেড়ে চলে গেলেও তাদের দোসররা কিশোরগঞ্জে শক্ত অবস্থান ধরে রাখে।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরে উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ওইদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল কিশোরগঞ্জ শহরের চারপাশে সশস্ত্র অবস্থান নেন। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শহরের পূর্ব দিক দিয়ে কমান্ডার কবীর উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রথমে একদল মুক্তিযোদ্ধা কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করেন। এর পরপরই অন্যান্য প্রবেশ পথ দিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে শহরে প্রবেশ করতে থাকেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের খবরে মুক্তিকামী জনতাও উল্লাস করে স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। সামান্য প্রতিরোধের পরই পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় দোসররা আত্মসমর্পণ করে। শহরের শহীদী মসজিদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রসমর্পণ করে হানাদার বাহিনীর দোসররা। এভাবেই বিজয় দিবসের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের আকাশে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
বাংলার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্মভূমি এই কিশোরগঞ্জ। বীরপ্রতীক সেতারা বেগম, বীরপ্রতীক কর্নেল হায়দার এবং বীরপ্রতীক নূরুল ইসলাম খান পাঠানের বাড়ি এই কিশোরগঞ্জে। এ অঞ্চলের মানুষ এ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গর্ব করে।
১৩ অক্টোবর পাক বাহিনীর দালালরা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে ছয় শতাধিক মানুষকে স্থানীয় বড়ইতলায় জড়ো করে। পরে সেখানে পাক সেনারা গুলিবর্ষণ ও বেয়নেট চার্জ করে ৩৬৫ জন নিরীহ মানুষকে খুন করে।
কিশোরগঞ্জকে শত্রু মুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। পরিস্থিতি খারাপ দেখে রাজাকার বাহিনী বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব করে। অধ্যাপক জিয়া উদ্দিন আহমেদ ও আজিম উদ্দিন হাই স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করার খবর পাঠায় রাজাকার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কবীর উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের চারপাশ ঘিরে ফেলে শক্ত অবস্থান নেয় মুক্তিযোদ্ধারা।
শহরকে শত্রুমুক্ত করতে ১৬ ডিসেম্বর রাতে চারদিক থেকে গেরিলা মুক্তিসেনারা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহানের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী প্রচন্ড গুলি বর্ষন করলে হানাদার বাহিনীর দোসররা কম্পিত হয়ে ওঠে। সেদিন রাতে কয়েকজন রাজাকারের মৃত্যু হয়। গভীর রাতে মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানি কমান্ডার কবীর উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার দিলীপ সরকার, ড. মাসুদুল কাদের সহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল করিমগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের নিকটে সতাল এলাকায় এসে অবস্থান নেয়।
১৭ ডিসেম্বর সকালে একটি খোলা জিপে করে কবির উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল প্রথম কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। অন্য একটি দল মানিক,হান্নান মোল্লা, কামালের নেতৃত্বে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে কিশোরগঞ্জ প্রবেশের সময় কামালিয়ারচর ও খিলপাড়া এলাকায় পাকিস্তানি দোসরদের বাধার সম্মুখীন হয়। বাধা অতিক্রম করে সেই মুক্তিবাহিনীর দল কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করে।
বিভিন্ন দিক থেকে মুক্তিসেনারা ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহানের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীও কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করে। শহরের পুরান থানা শহীদী মসজিদ সংলগ্ন ইসলামিয়া ছাত্রাবাস মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদর বাহিনী। কিশোরগঞ্জের আকাশে বাতাসে সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো জয় বাংলার স্লোগান উড়েছিল লাল সবুজের পতাকা।এভাবেই ১৭ই ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ শহর শত্রু মুক্ত হয়েছিল।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৭ ডিসেম্বর সকালে কমান্ডার কবীর উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল বিজয় ধ্বনিতে পূর্ব দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। তারপর বিভিন্ন প্রবেশ পথ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে শহরে আসতে থাকে। মুক্তিকামী জনতাও উল্লাস করে স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। সামান্য প্রতিরোধের পর পাক বাহিনীর এদেশীয় দোসররা আত্মসমর্পণ করে। তারা শহরের শহীদী মসজিদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার ভূপাল নন্দী জানান, ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৯ টায় কমান্ডার কবীর উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল শহরের পূর্ব দিক দিয়ে বিজয় ধ্বনিতে কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। তারপর শহরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ দিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে শহরে আসতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের খবরে মুক্তিকামী জনতাও উল্লাস করে স্বাধীনতার শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। সামান্য প্রতিরোধের পরই পাকবাহিনীর এদেশীয় দোসররা আত্মসমর্পণ করে। শহরের শহীদী মসজিদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে পাকবাহিনীর দোসররা। এভাবেই বিজয় দিবসের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের আকাশে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় টগবগে যুবক। তিনি সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, দেশের বেশির ভাগ জায়গায় যখন বিজয় নিশান উড়ছে, তখনো তারা পাক দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তারা শহরের চারিদিক থেকে ঘেরাও করেন। পরের দিন ভোরের আজানের পর কিশোরগঞ্জ হানাদারমুক্ত করেন।
কিশোরগঞ্জে বর্বর হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন নরপশু মেজর ইফতেখার। এই নরপশুর পাশবিকতা কিশোরগঞ্জে এক বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল। নরপশুদের সবচেয়ে নৃশংসতম ঘটনাটি ঘটে ১৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বড়ইতলা নামক স্থানে। হানাদার বাহিনী এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় আশপাশের প্রায় ৬-৭ টি গ্রামের নিরীহ লোকদেরকে জড়ো করে এক পর্যায়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে ৩৬৫ জন গ্রামবাসীকে। আহত অবস্থায় আজো কেউ কেউ বেঁচে আছেন।
সম্ভবত ৪ মার্চ ৭১ সালে কিশোরঞ্জ শহরে সর্ব প্রথম স্বাধীনতার স্বপক্ষে বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত এক বিরাট মিছিল বের হয়। ১০ মার্চ রথখলার মাঠে স্বাধীনতার পতাকাও উঠে গেছে। সেদিন এক সমাবেশে বেতার ও টিভি শিল্পী বিপুল ভূট্টাচার্য গান গেয়েছিল-মানবো না মানবো না মিলিটারির কোনো শাসন মানবো না।
কিশোরগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের খণ্ড চিত্র
১৯৭১-এর মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিফৌজের একটি দল কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের কালিকাপ্রসাদ স্টেশনের অদূরে একটি রেলসেতু ধ্বংস করে দেয়। এতে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়।
জুলাইয়ে গচিহাটা রেলস্টেশনের কাছে মাইন পেতে গেরিলারা একটি সৈন্যবাহী ট্রেন বিধ্বস্ত করে। এতে দুই চালক, ১০ পাঞ্জাবি পুলিশ ও ২০ পাক সেনা নিহত হয়।
২ আগস্ট গেরিলা যোদ্ধারা সরারচর রেলস্টেশনে হামলা চালিয়ে সিগন্যাল বোর্ড ও টেলিগ্রাফ যন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। পরে পাক বাহিনী স্থানীয় জনগণের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে।
৭ থেকে ১৬ আগস্ট কটিয়াদী অ্যাম্বুশ। এটি কিশোরগঞ্জ জেলায় সর্ববৃহৎ যুদ্ধ। নরসিংদী জেলার বেলাবোয় জয়লাভ করার পর হানাদার বাহিনী বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ৭ আগস্ট থেকে মুক্তিবাহিনী তাদের চলাচল কড়া পর্যবেক্ষণে রাখে। ১৬ আগস্ট পাক বাহিনী মোটর ল যোগে কটিয়াদী যাচ্ছিল। মুক্তিবাহিনী আগে থেকেই অ্যাম্বুশ পেতে বসে ছিল। গুলির আওতায় আসামাত্র চারদিক থেকে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ শুরু করে দেন তারা। সাঁড়াশি যোদ্ধা হাবিলদার আকমল আলীর নেতৃত্বে এ যুদ্ধে কয়েকটি ল ডুবে যায়। দু-তিনটি পালিয়ে যায়। আক্রমণে ১৩৪ পাক সেনা নিহত হয়। আহত হয় অনেকে। মুক্তিযোদ্ধারা এ যুদ্ধে বিশেষ সাহসের পরিচয় দেন।
১৪ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বাজিতপুর থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নিহত হয়।
৪ অক্টোবর গেরিলা যোদ্ধারা কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ সড়কের টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
২১ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের হটিয়ে দিয়ে বাজিতপুর থানা দখল করে ফেলে। এ সময় সংঘর্ষ শেষে অস্ত্রসহ ১৭ রাজাকার বন্দি হয়। কিছু গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। এরইমধ্যে কিশোরগঞ্জের আটটি থানা পাক হানাদারমুক্ত হয়।
নভেম্বর-ডিসেম্বরেই মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে চারদিক থেকে ব্যাপক গেরিলা আক্রমণ শুরু করে হানাদার ও রাজাকারদের কোণঠাসা করে ফেলে।
৪ অক্টোবর গেরিলা যোদ্ধারা কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রোডের টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ২১ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের হটিয়ে বাজিতপুর থানা দখল করে নেন। এ যুদ্ধে ১৭ জন রাজাকার বন্দি হয়।
১ নভেম্বর পাক বাহিনী গচিহাটায় মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালায়। পাল্টা আঘাতে ১৫ পাক সেনা নিহত হয়। ৫ নভেম্বর ১০টি থানা পাক সেনা মুক্ত হয়। কিশোরগঞ্জ সদরে পাক বাহিনী প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গেরিলা যোদ্ধাদের দুঃসাহসিক আক্রমণে পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরে ২৪ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। গেরিলারা কিশোরগঞ্জ-গৌরীপুর ও কিশোরগঞ্জ-ভৈরবের মধ্যবর্তী রেলসেতু ও কালভার্ট উড়িয়ে দেন এবং রেলপথ উপড়ে ফেলে রেল যোগাযোগ অচল করে দেন। ময়মনসিংহ রোডের সেতুগুলোও মুক্তিফৌজ মাইন দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়।
১০ নভেম্বর লাখী বাজারে অ্যাম্বুশ পেতে গেরিলারা ৭ খানসেনা খতম ও ১৭ জনকে আহত অবস্থায় বন্দি করেন।
১১ নভেম্বর হোসেনপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে ২৪ জন অনিয়মিত পাক সেনা ও ১৫ জন পাঞ্জাবি পুলিশ নিহত হয়। ৭৯টি রাইফেলসহ প্রচুর গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। ১৪ নভেম্বর মুক্তিফৌজের অ্যাম্বুশে পড়ে কিশোরগঞ্জে ৬ পাক সেনা নিহত হয়।
১৮ নভেম্বর শহরতলি শোলাকিয়ায় রাজাকার ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রসহ ৫ রাজাকারকে বন্দি করেন। ওইদিন হোসেনপুরেও ১৪ রাজাকার বন্দি হয়।
২০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী গচিহাটা-যশোদল এলাকার প্রায় দুই মাইল রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং রেলপথ কেটে মাঠের সমান করে দেয়। পাক বাহিনী ফের লাইন চালুর চেষ্টা করলে মুক্তিবাহিনী তা ব্যর্থ করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জ শহরে থেকে আগত পাক সেনাদের ওপর প্রবল গোলাবর্ষণ করলে এবারও পাক বাহিনী পালিয়ে যায়।
২২ থেকে ২৫ নভেম্বর চারদিকে একযোগে তুমুল যুদ্ধ শুরু করে দামাল মুক্তিসেনারা এবং জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ায়। ২৫ ও ২৬ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা শহরের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। শহরের উপকণ্ঠ প্যারাভাঙ্গায় পাক সেনাদের সঙ্গে এক সম্মুখযুদ্ধে খায়রুল জাহান বীর প্রতীক শহিদ হন।
ওইদিনই মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি ও গেরিলা আক্রমণে বিপর্যস্ত, ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পাক হানাদার বাহিনী ৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ থেকে চলে যায়। কিন্তু তাদের তাঁবেদার দালাল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনী কিশোরগঞ্জ সদরকে আরো ১২ দিন পাকিস্তান বানিয়ে রাখে।
কিশোরগঞ্জে রাজাকারদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। চল্লিশের দশক থেকেই এখানে সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় মৌলবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির প্রাধান্য ছিল। মোনায়েম খান, নূরুল আমিন থেকে শুরু করে ’৭১-এ এদের দোসর দালালরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে ও স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত তৎপর ছিল।
অবশেষে সব উৎকণ্ঠা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৭ ডিসেম্বর সকাল থেকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে মুক্তিবাহিনী শহরে প্রবেশ করে। ক্যাপ্টেন চৌহানের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীও সেদিন কিশোরগঞ্জে আসে। মুক্তিযোদ্ধা, মিত্রবাহিনী আর জনতার উচ্ছ্বাস-উল্লাসের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে কিশোরগঞ্জের মুক্ত আকাশে। পাক হানাদার ক্যাম্প জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে ‘মুক্ত’ কিশোরগঞ্জে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ায় কিশোরগঞ্জের মুক্তিসেনা ও জনতা।
কিশোরগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা যারা বিভিন্ন রণাঙ্গণে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মেজর এটিএম হায়দার বীর উত্তম, সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রম, শহীদ খায়রুল জাহান বীরপ্রতীক, শহীদ চিশতী, শহীদ সেলিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ, নুরুল ইসলাম বীরপ্রতীক, মতিউর রহমান বীরবিক্রমসহ অনেকেই।
৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু এ বিজয়ের দিনও কিশোরগঞ্জের মুক্তিপাগল জনগণ বিজয়ের আনন্দ থেকে বিরত ছিল। অজানা আশঙ্কায় ছিল তারা। দেশের মানুষ বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের এক দিন পর ১৭ ডিসেম্বর বিজয় আসে কিশোরগঞ্জে।
বিজয় দিবসেও এখানে পাক বাহিনীর দোসরদের সঙ্গে দামাল মুক্তিসেনাদের প্রচণ্ড লড়াই হয়, ঝরে রক্ত। ১৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ মুক্তদিবসে মুক্তিযোদ্ধারা ১০ জন কুখ্যাত রাজাকারকে খতম করেছিলেন।
যাদের নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জ শহর মুক্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম সাবসেক্টর কমান্ডার মাহবুবুল আলম, কবীর উদ্দীন আহমেদ, আব্দুল বারী খান, নাজিম উদ্দীন কবীর, ক্যাপ্টেন হামিদ, হান্নান মোল্লা, পলাশ, আনোয়ার কামাল, সারওয়ার জাহান, বকুল, বাবুল, অধ্যাপক গনি, ভর্ষা মিয়া, মাসুদ কাদের, মোস্তাফিজুর রহমান, অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ, নূরুন্নবী, অ্যাডভোকেট দোলন ভৌমিক, মিজানুর রহমান, মাসুদ হিলালী, অহিদুল হক, এম এ আফজাল, অ্যাডভোকেট আব্দুল আলী, মফিজ মাস্টার, আফাজউদ্দীন, সাব্বির আহমেদ মানিক, রফিকুল হক, আক্কাস আলী কাজী, আলী মাস্টার, মাহমুদুল ইসলাম জানু, খলিলুর রহমান খলিল, কোম্পানি কমান্ডার নজরুল ইসলাম প্রমুখ।
কিশোরগঞ্জের কৃতি সন্তান যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধ করে বীর যোদ্ধাদের কাতারেও নিজেদের নাম সংযোজন করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য,বীর আব্দুল মান্নান, মেজর আক্তারুজ্জামান রঞ্জন, ক্যাপ্টেন মতিন (পরে মেজর জেনারেল), বীর প্রতীক মেজর এটিএম হায়দার বীর উত্তম (২ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন) কর্নেল মাহফুজ বীর বিক্রম, নুরুল ইসলাম খান পাঠান বীর প্রতীক, মতিয়র রহমান খান বীর বিক্রম, মুর্শিদ খান,জাহাঙ্গির আলম ভূঁইয়া, রেজাউল করিম, পরশ, দেওয়ান জাহাঙ্গীর, ইদ্রিস আলী, আবতাব উদ্দীন প্রমুখ।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন