বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আবারও উত্তেজনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফ উপজেলায় এক বাংলাদেশি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
রোববার দুপুরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছীব্রিজ এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার দুপুরের দিকে তেচ্ছীব্রিজ এলাকায় সীমান্তের কাছাকাছি নিজ বাড়ির আঙিনায় অবস্থান করছিল শিশুটি। এ সময় মিয়ানমারের দিক থেকে হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হয়। বেশ কিছু গুলি এসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানুষের ঘরবাড়িতে বিদ্ধ হয়। দুর্ভাগ্যবশত, একটি গুলি সরাসরি শিশুটির শরীরে লাগলে সে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়ে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে হোয়াইক্যং এলাকার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরপরই শত শত গ্রামবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে টেকনাফ-কক্সবাজার প্রধান সড়কে অবস্থান নেন। তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষুব্ধ জনতা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কাছে সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি চললেও কার্যকর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার অভাবে আজ একটি প্রাণ অকালে ঝরে গেল।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। গোয়েন্দা তথ্য এবং স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, রাখাইনে বর্তমানে দেশটির সরকারি সেনাবাহিনী, বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে ত্রিমুখী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। এই গোষ্ঠীগুলো একে অপরের ওপর ভারী অস্ত্র ও মর্টার শেল ব্যবহার করছে, যার রেশ এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবারও এক বাংলাদেশি জেলে মিয়ানমারের দিক থেকে আসা গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আজকের এই শিশু নিহতের ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক উত্তেজনারই এক ভয়াবহ রূপ।
সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবি-এর পক্ষ থেকে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি)-কে এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের সীমান্তের একদম কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা এখন জমিতে কাজ করতে যেতে পারছেন না, এমনকি ঘরে ঘুমাতেও ভয় পাচ্ছেন। আকাশে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান বা হেলিকপ্টারের চক্কর এবং ভারী কামানের গর্জন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন