গোপালগঞ্জে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে হেবার ঘোষণা দলিলের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে গোপালগঞ্জ সদর রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক এবং তৎকালীন সাব রেজিস্ট্রার মো. ফারুক হোসেনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২২ ডিসেম্বর, গোপালগঞ্জ জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর গ্রামের বাসিন্দা এম এ আকাশ নামের এক ব্যক্তি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট শেখ তৈয়াবুর রহমান রাসেল নামে এক দলিল লেখক একটি হেবার ঘোষণা দলিল করেন। ৫৪৮৮ নম্বর দলিলটি গ্রহীতা হিসেবে দেখানো হয় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের নিজড়া পদ্মবিলা গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফ খানের দুই ছেলে আব্দুল কাইয়ুম খান ও সহিদুল ইসলাম খানকে।
এরমধ্যে আব্দুল কাইয়ুম খান দলিলের আগেই মৃত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।এই দলিলে ৬৫.১১ শতাংশ নাল জমির মূল্য ৭ লাখ ১২ হাজার এবং ১১.১০ শতাংশ বাড়ির মূল্য ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মোট ৭৬.২১ শতাংশ জমির মধ্যে ৩৮.১০৫ শতাংশ জমি মালিকানা লাভ করেন মৃত আব্দুল কাইয়ুম খান। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে যে, প্রায় ৫৩ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে। কিন্তু হেবার ঘোষণা দলিল করার প্রায় ১১ বছর আগে, ২০১১ সালের ২০ আগস্ট, আব্দুল কাইয়ুম খান মারা যান। এই মৃত্যু সনদ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. কামরুল হাসান (বাবুল) ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রদান করেছেন।
সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, আমার জানামতে ওই আব্দুল কাইয়ুম খান ২০১১ সালের ২০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।যা পরিষদের রেজিস্টার বইয়ের ৫৪ নং ক্রমিকে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তিকে গ্রহীতার স্থানে জীবিত দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। কারণ, আব্দুল কাইয়ুম খানের ওয়ারিশদের নামে সাব কবলা করতে হলে অনেক টাকা রাজস্ব দিতে হত। তাই কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দিতে হেবার ঘোষণা দলিলে আব্দুল কাইয়ুম খানকে জীবিত দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে এমন উল্লেখ করে আরও বলা হয়েছে, এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে দলিল লেখক শেখ তৈয়াবুর রহমান রাসেল ও সাব রেজিস্ট্রার মো. ফারুক হোসেন জড়িত রয়েছেন। ফলে সরকারের প্রায় ৫৩ হাজার টাকা রাজস্ব হারানোর ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই দলিলের ১২ নম্বর কলামে চৌহদ্দি পূরণ করা হয়নি এবং ১৭ নম্বর কলামে ১ নম্বর দাতা লিলি বেগমের স্বাক্ষরও নেই। এই কারণে, দলিলটি সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়নি। বিষয়টি তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে।
অভিযুক্ত দলিল লেখক শেখ তৈয়াবুর রহমান রাসেল বলেন, যতটুকু আমি জানি, যখন দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল, তখন আমার গ্রহীতা জীবিত ছিলেন। আমার জানামতে আব্দুল কাইয়ুম খান বিগত ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২১ সালের ২০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া আমি অন্যান্য সব তথ্য যাচাই-বাছাই করেই দলিল লিখেছি। এখন কেউ শত্রুতা বশত আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন।
সাবেক সাব রেজিস্ট্রার মো. ফারুক হোসেন বলেন, ২০২১ সালে আমি ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা সব কাগজপত্র যাচাই করেই দলিল রেজিস্ট্রি করি। আগের বিষয়গুলো আমার মনে নেই, তবে যদি কোনো সমস্যা হয়ে থাকে, সেটা আমার জানা নেই। দলিল যারা লেখেন, তারা সব জানেন।
গোপালগঞ্জ জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ের উপপরিচালক রাম প্রসাদ মণ্ডল বলেন, অভিযোগটি পেয়ে আমরা ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে যে নির্দেশনা আসবে সেইভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এসব বিষয়ে জানতে জেলা রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের কার্যালয়ে গেলে তিনি সাংবাদিক উপস্থিতি টের পেয়ে মুঠোফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তিতে ফোন দিলে তিনি খুব ব্যস্ত আছেন বলে জানান এবং এখন কথা বলা সম্ভব নয় বলে ফোনটি কেটে দেন।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন