শীতের হাড়কাঁপানো রাতে যখন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে, ঠিক তখনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হলো ২২ বছর বয়সী গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী এবং তাঁর মাত্র ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফকে।
একদিকে যখন দেশজুড়ে নির্বাচনের দামামা বাজছে, তখন বাগেরহাটের এই নিভৃত পল্লীতে বেজে উঠেছে শোকের করুণ সুর। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মানবিক সংকট ও মানসিক অবসাদের এক করুণ আখ্যান।
গত শুক্রবার দুপুরের শান্ত গ্রামটি হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে। সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় কানিজ সুবর্ণার ঝুলন্ত মরদেহ এবং তাঁর কোলের শিশু নাজিফের নিথর দেহ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব আর স্বামী কারাবন্দী থাকায় সৃষ্ট মানসিক বিষণ্ণতা থেকেই হয়তো আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন এই তরুণী। তবে একইসাথে ৯ মাসের শিশুর মৃত্যু নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও রহস্য দানা বেঁধেছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিকটি ফুটে ওঠে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে। কানিজ সুবর্ণার স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দাম গত বছরের এপ্রিল থেকে কারাগারে আছেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও নিজের ৯ মাস বয়সী সন্তানকে একবারও কোলে নিতে পারেননি তিনি।
শনিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ছুটে যান যশোরে। প্রশাসনের বিশেষ অনুমতিতে কারাফটকেই স্ত্রী ও সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখেন জুয়েল। লোহার শিকের ওপাশ থেকে নিথর দেহগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা এক পিতার আহাজারি উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয়। মানবিক কারণে কারাফটকে পরিবারের ছয় সদস্যকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল জেল কর্তৃপক্ষ।
নিজেদের প্রিয়জনদের জানাজায় অংশ নিতে জুয়েলের প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও তা সফল হয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানিয়েছেন, প্যারোলের আবেদনটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ যশোরের জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে করার নিয়ম থাকায় বাগেরহাট প্রশাসন কেবল সমন্বয়ের কাজটুকু করেছে। মূলত আইনি মারপ্যাঁচ আর কারাবন্দী থাকা জেলার ভিন্নতার কারণে শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারেননি জুয়েল।
কানিজ সুবর্ণার ভাই মো. শুভর কণ্ঠে ঝরছে কেবল আক্ষেপ। তিনি বলেন, 'আমার দুলাভাই ছেলেটাকে একবারও কোলে নিতে পারল না। বোনটা স্বামী কারাবন্দী থাকায় একদম ভেঙে পড়েছিল। তবে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, আমরা প্রশাসনের কাছে তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাই।'
জুয়েল হাসান ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন এবং পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। সন্তানের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পুরো সময়টাতেই তিনি ছিলেন পর্দার অন্তরালে।
এই বিয়োগান্তক ঘটনা আমাদের সমাজের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে:
মানসিক স্বাস্থ্য: একজন তরুণী মা কেন তাঁর ৯ মাসের শিশুকে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন? রাজনৈতিক অস্থিরতা আর প্রিয়জনের বিচ্ছেদ কি তবে সমাজকে এক চরম অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
মানবিক অধিকার: কারাবন্দী থাকলেও একজন পিতার কি অধিকার নেই নিজের মৃত সন্তানকে শেষবারের মতো স্পর্শ করার বা তার জানাজায় ইমামতি করার?
তদন্তের প্রয়োজনীয়তা: পরিবারের পক্ষ থেকে ওঠা রহস্যের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা জরুরী।
রাত ১১টা ২০ মিনিটে জানাজা শেষে যখন সাবেকডাঙ্গা গ্রামের মাটি মা ও ছেলেকে আপন করে নেয়, তখন সেখানে কোনো স্লোগান ছিল না, ছিল না কোনো রাজনৈতিক পরিচয়। ছিল কেবল এক পিতৃহীন শিশুর শূন্যতা আর এক হতভাগী মায়ের শেষ নিঃশ্বাস। বাগেরহাটের আকাশে তখন বিষাদের ছায়া, যা কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, বরং সমগ্র মানবতার এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেল।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন