আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের নির্বাচনী মাঠ ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনীত প্রার্থী ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, অন্যদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। এই দুই মেরুর লড়াইয়ে এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে এলাকাটি।
রোববার গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে নুরুল হক নুর তার জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দেশি-বিদেশি অপশক্তি নির্বাচন বানচালের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের লক্ষ্য করে নাশকতার নীল নকশা সাজানো হয়েছে।
রাত ১১টার পর দেওয়া ওই পোস্টে নুর অভিযোগ করেন, জাতীয় পর্যায়ের আলোচিত প্রার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। তিনি সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের দিকে। নুরের দাবি, এলাকায় ‘বহিরাগত’ সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে এবং তাকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।
ফেসবুক বার্তায় তিনি প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, "হাসান মামুনের লোকজনের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। তারা বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করছে।"
নুরুল হক নুর প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই তার কর্মী-সমর্থকদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেন:
পানপট্টি এলাকায় হামলা: গত শনিবার রাতে লিফলেট বিতরণ শেষে ফেরার পথে নুরের কর্মী রাকিবকে বেধড়ক মারধর করা হয়।
ডাকুয়া স্লুইস বাজারে পথরোধ: রবিবার সন্ধ্যায় চিকনিকান্দি থেকে ফেরার পথে একদল যুবক নিজেদের হাসান মামুনের সমর্থক পরিচয় দিয়ে নুরের গাড়িবহর থামানোর চেষ্টা করে এবং আক্রমণাত্মক স্লোগান দেয়। নূর দাবি করেন, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি কৌশল অবলম্বন করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
শ্রমিক অধিকার পরিষদে হামলা: এর আগে চরকপালভেরা এলাকায় শ্রমিক অধিকার পরিষদের নেতা রিয়াজের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যার দায়ও নুর হাসান মামুনের সমর্থকদের ওপর চাপিয়েছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনের সমীকরণটি বেশ জটিল। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল হিসেবে বিএনপি এই আসনটি নুরুল হক নুরের জন্য ছেড়ে দিলেও স্থানীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে বিরূপ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
শুধু তাই নয়, নুরের বিপক্ষে এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় গলাচিপা ও দশমিনা—এই দুই উপজেলা বিএনপি কমিটিই বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এর ফলে তৃণমূলের বড় একটি অংশ এখন নুরের বিরুদ্ধে ভেতরে-ভেতরে সক্রিয় বলে গুঞ্জন রয়েছে।
নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়ে পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, নুরুল হক নুর তাকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রতিটি প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অগ্রাধিকার।
এদিকে, অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হাসান মামুনের বক্তব্য জানতে তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করছেন, নুরের জনপ্রিয়তা কম থাকায় তিনি ‘সহানুভূতি’ পাওয়ার জন্য এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন।
জেলা রিটার্নিং কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী-৩ আসনে লড়াই হচ্ছে চতুর্মুখী। জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুর ও বিদ্রোহী হাসান মামুন ছাড়াও শক্ত অবস্থানে আছেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমির শাহ আলম (১১-দলীয় জোট) এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আবু বকর।
তবে মূল আলোচনা এখন আবর্তিত হচ্ছে নুর ও মামুনের দা-কুমড়ো সম্পর্ক নিয়ে। ১৮ জানুয়ারি হাসান মামুনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন নূর। সাধারণ ভোটাররা আশঙ্কা করছেন, ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, দুই পক্ষের এই স্নায়ুযুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন