গোয়ালন্দে পেঁয়াজের বীজ চাষ করে কৃষক হুমায়নের বাজিমাত 

মো. সাজ্জাদ হোসেন, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
গোয়ালন্দে পেঁয়াজের বীজ চাষ করে কৃষক হুমায়নের বাজিমাত 

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলায় কালো সোনাখ্যাত পেঁয়াজের বীজ চাষে কৃষক হুমায়নের বাজিমাত। পেঁয়াজের বীজ চাষেই ১০/১২ লক্ষাধিক টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে হুমায়নের। গোয়ালন্দের কৃষি উদ্যোক্তা হুমায়ন কৃষিতে বারবার পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন সফল কৃষক। হুমায়নের দেখাদেখিতে ‘কালো সোনা’খ্যাত পেঁয়াজের বীজ চাষ করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন উপজেলার অনেক চাষিরা। গত কয়েক বছরে পার্শ্ববর্তী জেলা ফরিদপুরসহ অন্যান্য জেলায় ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এবারও বীজ চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। 

কৃষি বিভাগ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এ উপজেলায় ৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ বপন করা হয়েছে। এসব বীজ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য জেলায় রপ্তানি করা সম্ভব হবে। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় ‌উপজেলায় প্রতি বছরই বাড়ছে পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন। দাম বেশি হওয়ায় এ বীজকে কৃষকেরা তুলনা করছেন সোনার সঙ্গে। 

গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৮ নং ওয়ার্ড তোরাপ শেখের পাড়া বাসিন্দা কৃষি উদ্যোক্তা হুমায়ন আহমেদ বলেন, গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আমি এবছর ৬শ' গ্রাম দানা বাইরে থেকে আমদানি করে ৪৪ শতাংশ জমিতে ৪'শ কেজি বুশরা জাতের গুটি পেঁয়াজ লাগিয়েছি। আশা করছি এই ক্ষেত থেকে ২০০ থেকে ২১০ কেজি বীজ সংগ্রহ করতে পারবো। যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর এই বীজ সংরক্ষণ করে প্যাকেট জাত করে বিক্রি করলে কেজি প্রতি ৮ হাজার টাকা দামে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে আড়াই লাখ টাকা খরচ বাবদ ১৩/১৪ লাখ টাকা লাভ করবো বলে আশা করছি।

সরেজমিনে উপজেলার তোরাপ শেখের পাড়া গ্রামের ফসলি মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, সাদা রঙের ফুলে ছেয়ে গেছে পেঁয়াজ বীজের ক্ষেত। মাঠজুড়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে সাদা রঙের পেঁয়াজ ফুল। সাদা ফুলের মধ্যেই রয়েছে কালো সোনা। আর কৃত্রিমভাবে পেঁয়াজের ফুলে পরাগায়ন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক হুমায়ন। তিনি তার ক্ষেতে পেঁয়াজের ফুল যাতে করে নষ্ট বা বাতাসের কারণে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে বীজের ক্ষেতে মাঝ বরাবর জাল বেঁধে দিয়েছেন। তার আধুনিক পদ্ধতি ইতোমধ্যে অনেক কৃষকের দৃষ্টি কেড়েছে এবং তাদের মধ্যে পেঁয়াজ বীজ বপনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

দেবগ্রাম এলাকার কিছু মাঠে দেখা যায়, সাদা রঙের ফুলে ছেয়ে গেছে পেঁয়াজ বীজের ক্ষেত। এসব ক্ষেত করে শুধু কৃষকেরাই লাভবান হননি বরং স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান এর সৃষ্টি হয়েছে। পেঁয়াজ ক্ষেতে দৈনিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন স্থানীয় যুবকেরা। উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারকে সহায়তা করছেন যুবকেরা। মাঠে ঘুরে দেখা যায়, সকাল হলেই এসব বীজ ক্ষেতের পরিচর্যায় জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ সেচ দেয়, আবার কেউ পোকা দমনের কীটনাশক স্প্রে নিয়ে এবং কেউ হাতের আলতো ছোঁয়ায় পরাগায়ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সাধারণত নভেম্বর মাস বীজতলায় বা জমিতে পেঁয়াজ বীজ বপনের সময়। বীজ পরিপক্ব হতে সময় লাগে ১৩০ থেকে ১৫০ দিন। পরাগায়ন না হলে পেঁয়াজ ফুলে পরিপক্বতা আসে না। আর এসব ফুলে পরাগায়নের প্রধান মাধ্যম হলো মৌমাছি। পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকেরা ক্ষেতে কীটনাশক ছেটান। কিন্তু সেই কীটনাশকে মারা পড়ছে উপকারী পোকা ও মৌমাছি। এ কারণে পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতে দিন দিন মৌমাছির আনাগোনা কমে যাচ্ছে। তাই হাতের স্পর্শে কৃত্রিমভাবে পরাগায়নের চেষ্টা চলছে। 

গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ রায়হানুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের বীজের চাহিদা সারা বাংলাদেশেই বাড়ছে। গোয়ালন্দে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের জন্য যেসকল কৃষকেরা আছেন প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বীজ উৎপাদন করছেন। এবছর বীজ উৎপাদনের জন্য পরিবেশ অনুকূলে থাকায় মানসম্মত বীজ উৎপাদন করতে পারবে বলে আশাকরি। পুরো উপজেলা জুড়ে প্রায় ৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্রীষ্মকালীন সময়ে পেঁয়াজের যে ঘাটতি রয়েছে সে ঘাটতি পূরণে কৃষকদের এখনি পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরাও এব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছি।

এএন