সিলেটের রাজনীতিতে এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম আরিফুল হক চৌধুরী। তৃণমূল থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি। ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক সাধারণ কাউন্সিলর হিসেবে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, ২৩ বছরের সেই কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে আজ তিনি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন।
মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবনের প্রথা ভেঙে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আরিফুল হক চৌধুরীর জনপ্রতিনিধিত্বের হাতেখড়ি হয়েছিল ২০০৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। কাউন্সিলর থাকাকালেই তিনি নিজের কর্মতৎপরতা এবং নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর এই সাংগঠনিক ও উন্নয়নমুখী চিন্তা তৎকালীন প্রতাপশালী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সাইফুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন, যা তাঁকে সিলেটের মূলধারার রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
২০০৭ সালের এক এগারোর পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় আরিফুল হক চৌধুরীকে কারাবরণ করতে হয়। তবে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে রাজপথে ফেরেন। ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে তিনি এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
সিলেটের অবিসংবাদিত নেতা এবং প্রতিষ্ঠাকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে তিনি প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক মহলে চমক সৃষ্টি করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে ২০২৩ সালের সিটি নির্বাচনে দলের বৃহত্তর স্বার্থ এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। দল সেখানে মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি প্রাথমিকভাবে অন্য কোনো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে, ৫ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হন।
একেবারে শেষ সময়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেও তিনি জনসমর্থনের জোয়ার তৈরি করেন। সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৪৬ ভোট পেয়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৩৭১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন।
আরিফুল হকের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে। এরপর সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও আহ্বায়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি সবসময়ই লক্ষ্যণীয় ছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন কমিটির বিভাগীয় আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজের প্রশাসনিক ও সমন্বয় দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন।
পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর এক প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর এই সাফল্যের জন্য দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সিলেট-৪ আসনের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সিলেটের মানুষ সবসময় আমার ওপর আস্থা রেখেছে।
বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের সন্তান হিসেবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য এক বড় সুযোগ। রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় আমি আমার সর্বোচ্চ বিলিয়ে দেব। আরিফুল হক চৌধুরীর এই উত্থান কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং এটি তৃণমূলের রাজনীতিকদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন