বাংলাদেশের অধিকাংশ কারাগারের মতো মাগুরা জেলা কারাগারও দীর্ঘদিন ধরে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বন্দির চাপ বহন করছে। ১৭২ জন ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বর্তমানে অবস্থান করছেন প্রায় ৪০০ বন্দি। এমন বাস্তবতায় বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কারা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই প্রবীণ বন্দিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে মাগুরা জেলা কারাগার।
মঙ্গলবার সকালে কারাভ্যন্তরে প্রথমবারের মতো ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৪৫ জন বন্দিকে নিয়ে বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বন্দিদের রক্ত সংগ্রহ করে র্যান্ডম ব্লাড সুগার (আরবিএস), লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিন এবং ইসিজি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা থাকলেও নির্দিষ্ট বয়সী বন্দিদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মসূচির নজির খুব বেশি নেই। সে বিবেচনায় মাগুরা জেলা কারাগারের এ উদ্যোগ বন্দিকল্যাণে নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন মাগুরার সিভিল সার্জন ডা. মো. শামীম কবির। বিশেষ অতিথি ছিলেন ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মাগুরা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোহসিন উদ্দীন ফকির। এছাড়া কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. এজাজ আহম্মেদ রোচি এবং জেলা কারাগারের ডিপ্লোমা নার্স বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেল সুপার শেখ মো. মহিউদ্দিন হায়দার।
সিভিল সার্জন ডা. মো. শামীম কবির বলেন, “বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কারাগারে থাকা প্রবীণ বন্দিদের জন্য এ ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মাগুরা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোহসিন উদ্দীন ফকির বলেন, “একজন মানুষ বন্দি হলেও তার স্বাস্থ্যসেবার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। কারাগারে থাকা প্রবীণ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মসূচিতে অংশ নেন ৯৫ বছর বয়সী বন্দি মোহাম্মদ জলিল মোল্লা। এক বছর ধরে সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে কারাগারে থাকা এই প্রবীণ বন্দি জানান, কারাগারে এমন উদ্যোগ তাকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নতুন করে জানার সুযোগ দিয়েছে। তিনি কারা কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানান।
অপরদিকে ৭০ বছর বয়সী বন্দি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “কারাগারের ভেতরে থেকেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পেরে ভালো লাগছে। এতে নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।”
জেল সুপার শেখ মো. মহিউদ্দিন হায়দার বলেন, “বর্তমানে মাগুরা জেলা কারাগারে ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৪৫ জন বন্দি রয়েছেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। মাননীয় কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহার হোসেনের নির্দেশনায় আমরা বন্দিদের কল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছি। এর আগে কারারক্ষীদের নিয়েও একই ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।”
কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য। সেই চিন্তা থেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, দেশের কারাগারগুলোতে প্রবীণ বন্দিদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি সময়ের দাবি। মাগুরা জেলা কারাগারের এ উদ্যোগ অন্যান্য কারাগারের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বন্দিদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আকস্মিক অসুস্থতা ও কারাভ্যন্তরে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এটি কারাগারকে শুধু শাস্তি প্রদানের স্থান নয়, বরং মানবিক ও সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথকে আরও শক্তিশালী করবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন