বহু নাটকীয়তার পর ডিবির হাতে ছাত্রদল নেতা ফেন্সি সামির গ্রেপ্তার

আলী রেজা রাজু, সাভার প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
বহু নাটকীয়তার পর ডিবির হাতে ছাত্রদল নেতা ফেন্সি সামির গ্রেপ্তার

ঢাকার সাভারে আলোচিত দুটি মামলার প্রধান আসামি ও বহিষ্কৃত সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামিরকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

দীর্ঘ নয় দিন আত্মগোপনে থাকার পর বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর সদরঘাট জংশন রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইদুল ইসলাম।

গ্রেপ্তার মাহাবুব হোসেন সামির সাভার সদর ইউনিয়নের দেওগাঁও এলাকার মৃত মতিউর রহমানের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং পরিচালনা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, সম্প্রতি সাভারে দায়ের হওয়া দুটি আলোচিত মামলার প্রধান আসামি হিসেবে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।

ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুন সাভার মডেল থানায় লাবনী বেগম নামে এক নারী লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এতে অভিযোগ করা হয়, তার খালাতো ভাই শামীম রেজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ থেকে মাদক মামলায় আটক এক ব্যক্তির জামিনের কথা বলে দীর্ঘদিন ধরে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন মাহাবুব হোসেন সামির। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে তার নেতৃত্বে একাধিকবার সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের ঘটনা ঘটে।

এজাহার অনুযায়ী, গত ২৪ মে রাজাশন আমতলা এলাকায় শামীম রেজার বাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ ৪ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা ও গ্যারেজ থেকে ১২টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লুট করা হয়। একই সময় ক্যাশবক্স থেকে আরও ৯০ হাজার টাকা নিয়ে যায় হামলাকারীরা। পরে ২৭ মে আরও ছয়টি অটোরিকশা, ১২ জুন পাঁচটি অটোরিকশা, ১৬ জুন প্রায় ১৪ লাখ টাকার ব্যাটারি এবং প্রায় ৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়।

এ ছাড়া ১২ জুন রাতে শামীম রেজার বাসায় হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের মারধর, এক নারীকে লাঞ্ছিত করা, একটি শিশুকে আছড়ে ফেলা, স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন। তদন্ত শেষে মাহাবুব হোসেন সামিরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট, হামলা, নারী লাঞ্ছনা ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

এদিকে শামীম রেজার গ্যারেজ থেকে অর্ধকোটি টাকার বেশি মূল্যের ২৩টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লুটের ঘটনার পর আরও একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন ফেন্সি সামির। অভিযোগ রয়েছে, গত ২ জুন রিপন ঋষি নামে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী কিশোরকে অপহরণ করে নির্যাতন চালান তিনি ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় পৃথক একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুটি মামলাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সদ্য গঠিত সাভার থানা ছাত্রদলের কমিটি। পরে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল মাহাবুব হোসেন সামিরকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আলোচিত রুবেল হত্যা মামলা, মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জুলাই আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আন্দোলন দমনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তার বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে 'জুলাই যোদ্ধা' পরিচয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন।

এ ছাড়া তার ভাই যুবলীগ নেতা হৃদয় হোসেন ওরফে ফর্মা হৃদয় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও সে সময় আলোচনায় আসে। এরপরও মাহাবুব হোসেন সামির ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় সাভার মডেল থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে মাহাবুব হোসেন সামিরকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অটোরিকশা, ব্যাটারি ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই আইনের বাইরে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না।

সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও চলতি দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, দুই মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় তদন্তে গতি আসবে। তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। একই সঙ্গে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ঢাকা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মাহাবুব হোসেন সামিরকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুটি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

এম জি