বলিউডের ইতিহাসের প্রথম সুপারস্টার বলা হয় তাকে। যার হাসিতে কেল্লাফতে হতো, যার গাড়ির ধুলো নিয়ে কপালে তিলক কাটতেন নারী ভক্তরা, সেই রাজেশ খান্না মৃত্যুর ১৪ বছর পরেও খবরের শিরোনামে। তবে এবার কোনো সিনেমার জন্য নয়, বরং তার ব্যক্তিগত জীবনের এক রহস্যময় গোপন বিয়ে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
কিংবদন্তি এই অভিনেতার জীবনের শেষ দিনগুলোতে তার সঙ্গী কে ছিলেন, আর সেই সঙ্গীর আইনি ও সামাজিক মর্যাদা কী, তা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফের চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অভিনেত্রী অনিতা আদভানির সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এবং রাজেশের ঘনিষ্ঠ মহলের বয়ান এই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।
রাজেশ খান্নার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়ার সাথে তার বিয়ে। ১৯৭৩ সালে যখন তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন ডিম্পল কেবল ববি সিনেমার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছেন। কিন্তু বিয়ের পর রাজেশ খান্না এক কঠিন শর্ত আরোপ করেন যে ডিম্পলকে অভিনয় ছাড়তে হবে।
আট বছরের সংসার এবং দুই সন্তান থাকা সত্ত্বেও ক্যারিয়ারের নেশা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে ১৯৮২ সালে রাজেশের রাজকীয় বাংলো আশীর্বাদ ছাড়েন ডিম্পল। যদিও তাদের আইনি বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে, কিন্তু মানসিকভাবে তারা একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গিয়েছিলেন।
ডিম্পল কাপাডিয়া ঘর ছাড়ার পর নির্জন আশীর্বাদ বাংলোতে রাজেশের জীবনে প্রবেশ করেন অনিতা আদভানি। দীর্ঘ সময় ধরে তারা লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন বলে দাবি করা হয়। রাজেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভূপেশ রাসিনের পুত্র হর্ষ রাসিন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি অনিতাকে রাজেশের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখেছেন। তবে জনসমক্ষে রাজেশ কখনোই এই সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি।
২০১২ সালে রাজেশ খান্নার প্রয়াণের পর থেকেই অনিতা নিজেকে তার বিধবা স্ত্রী হিসেবে দাবি করে আসছেন। যদিও রাজেশের পরিবার অর্থাৎ ডিম্পল কাপাডিয়া, টুইঙ্কেল খান্না ও রিঙ্কি খান্না কখনোই অনিতাকে কোনো স্বীকৃতি দেননি।
সম্প্রতি রিয়ালিটি শো বিগ বস এর মঞ্চে এসে অনিতা আদভানি সেই গোপন বিয়ের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তার দাবি অনুযায়ী, তাদের বিয়েটা কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হয়নি, বরং ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন। অনিতা বলেন, ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই জানতেন আমরা একসাথে থাকি। আমাদের বাড়িতে একটি ছোট মন্দির ছিল। একদিন সেই মন্দিরে ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে রাজেশ আমার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি আমাকে একটি সোনার মঙ্গলসূত্র পরার অনুরোধ করেন।
তিনি বলতেন, জনসমক্ষে ঘোষণা না করলেও ঈশ্বরের কাছে আমিই তার স্ত্রী। অনিতার এই দাবি সত্য হলে, রাজেশ খান্না তার জীবনের শেষ দুই দশক একজন নারীর সাথে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছেন, যাকে বিশ্ব চিনত কেবল তার বান্ধবী হিসেবে।
রাজেশ খান্নার মৃত্যুর পর তার বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েছেন অনিতা। তিনি নিজেকে রাজেশের আইনি স্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় আদালত শেষ পর্যন্ত তার দাবি খারিজ করে দেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, যেহেতু রাজেশের সাথে ডিম্পল কাপাডিয়ার আইনি বিচ্ছেদ হয়নি, তাই অন্য কারো সাথে তার বিয়ে বা সম্পর্ক আইনি বৈধতা পায় না। তবে আইনি স্বীকৃতি না পেলেও অনিতা অনড়। তার মতে, রাজেশ খান্না সত্তর ও আশির দশকের হার্টথ্রব হয়েও জীবনের শেষ দিনগুলোতে ভীষণ একা ছিলেন। সেই একাকীত্বের সময়ে তিনিই ছিলেন তার একমাত্র সহচর।
রাজেশ খান্না ছিলেন এমন একজন অভিনেতা যার জন্য মেয়েরা রক্ত দিয়ে চিঠি লিখতেন। কিন্তু পর্দার এই রোমান্টিক হিরোর বাস্তব জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ভরা। ডিম্পল কাপাডিয়ার সাথে বিচ্ছেদের পর একাধিক অভিনেত্রীর সাথে তার নাম জড়ালেও, অনিতা আদভানিই ছিলেন একমাত্র নারী যাকে তিনি নিজের বাড়িতে স্থান দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিতা তার সেবা করেছেন বলে দাবি করেন রাজেশের ঘনিষ্ঠদের একাংশ।
রাজেশ খান্নার জীবন ছিল এক খোলা বইয়ের মতো, অথচ তার পরতে পরতে ছিল রহস্য। তার গোপন বিয়ে বা অনিতা আদভানির সাথে তার সম্পর্কটি কি কেবল একাকীত্বের আশ্রয় ছিল, নাকি গভীর কোনো ভালোবাসা, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে বিংশ শতাব্দীর এই মহানায়কের ব্যক্তিগত জীবনের এই ধোঁয়াশা প্রমাণ করে যে, খ্যাতির শিখরে থাকলেও ব্যক্তিগত সুখ অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
ডিম্পল কাপাডিয়ার আভিজাত্য আর অনিতা আদভানির দাবি, এই দুইয়ের মাঝে রাজেশ খান্নার আশীর্বাদ বাংলোটি আজও এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলিউডের ইতিহাসে রাজেশের এই গোপন অধ্যায় হয়তো চিরকালই অমীমাংসিত থেকে যাবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন