বলিউড থেকে হলিউড, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার এই দীর্ঘ এবং সফল যাত্রার পেছনে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন তাঁর মা ডা. মধু চোপড়া। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে মধু চোপড়া প্রিয়াঙ্কাকে লালন-পালন করার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ কিছু চিন্তাধারা এবং কৌশলের কথা শেয়ার করেছেন।
সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে মধু চোপড়ার প্রধান দর্শন ছিল আত্মবিশ্বাস। তাঁর মতে, সন্তানদের শিক্ষিত করার চেয়েও বেশি জরুরি তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা। প্রিয়াঙ্কা যখন ছোট ছিলেন, তখন থেকেই তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে উৎসাহিত করা হতো। মধু চোপড়া বিশ্বাস করেন, একটি শিশু যখন জানে যে তার মতামতের গুরুত্ব আছে, তখন সে মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অনেক বাবা-মা সন্তানদের সব সময় আগলে রাখতে চান যাতে তারা কোনো ভুল না করে, কিন্তু মধু চোপড়া ছিলেন এর উল্টো। তিনি মনে করেন ভুল করা শেখার একটি বড় অংশ। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে ভুল করতে দিতেন এবং সেই ভুলের মাশুল নিজেকেই দিতে বলতেন। এতে প্রিয়াঙ্কা ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে শিখেছেন।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি ছিল সন্তানকে নিজের জন্য আফসোস করতে দেওয়া। মধু চোপড়া বলেন, যখন প্রিয়াঙ্কা কোনো কারণে মন খারাপ করতেন বা ব্যর্থ হতেন, তখন তিনি তড়িঘড়ি করে তাঁকে শান্ত করতে যেতেন না।
পরিবর্তে, তিনি প্রিয়াঙ্কাকে কিছুটা সময় দিতেন যাতে সে নিজের দুঃখটা অনুভব করতে পারে। নেতিবাচক আবেগগুলো এড়িয়ে গেলে সেগুলো ভেতরে জমা হয়ে থাকে বলে মধু চোপড়া মনে করেন। সন্তানকে কিছুটা সময় নিজের জন্য আফসোস করতে দিলে সে নিজেই নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং মানসিকভাবে আরও পরিণত হয়।
চোপড়া পরিবারে একটি নিয়ম ছিল মা ও মেয়ের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা থাকবে না। মধু চোপড়া প্রিয়াঙ্কাকে এমন এক বন্ধুসুলভ পরিবেশ দিয়েছিলেন যেখানে প্রিয়াঙ্কা তাঁর জীবনের যে কোনো ভালো বা খারাপ লাগার কথা নির্ভয়ে বলতে পারতেন। এই খোলামেলা সম্পর্কই প্রিয়াঙ্কাকে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে।
মধু চোপড়া প্রিয়াঙ্কাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সাথে একটি অদৃশ্য দায়িত্ববোধও জড়িয়ে ছিল। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে বুঝিয়েছিলেন যে স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করা নয়, বরং সঠিক কাজটি বেছে নেওয়া। প্রিয়াঙ্কা যখন বিদেশে পড়াশোনা করতে যান, তখন এই মূল্যবোধই তাঁকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করেছিল।
বর্তমান যুগে বাবা-মায়েরা প্রায়ই নিজের সন্তানের সাথে অন্য শিশুর তুলনা করেন, তবে ডা. মধু চোপড়া কঠোরভাবে এর বিরোধী ছিলেন। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে তাঁর নিজের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছিলেন। অন্য কেউ কী করছে তার চেয়ে প্রিয়াঙ্কা নিজে গতকালের চেয়ে আজ কতটা উন্নতি করল, সেটাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রিয়াঙ্কা আজ যে অবস্থানে আছেন, তার পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। মধু চোপড়া তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে কোনো কিছুই থালায় সাজিয়ে আসবে না। সফল হতে হলে ঘাম ঝরাতে হবে। প্রিয়াঙ্কার কাজের প্রতি যে একাগ্রতা আমরা দেখি, তা মূলত তাঁর মায়ের দেওয়া শিক্ষারই ফল।
ডা. মধু চোপড়ার এই অভিভাবকত্ব বিষয়ক টিপসগুলো আজকের আধুনিক বাবা-মায়েদের জন্য এক দারুণ উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে কঠোর শাসন নয়, বরং ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং সন্তানকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়াই হলো আদর্শ মানুষ গড়ার আসল উপায়। প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার জীবনের এই গল্প আমাদের শেখায় যে একটি মজবুত ভিত্তি থাকলে আকাশ ছোঁয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মধু চোপড়ার সেই বিশেষ উক্তি, তাদের নিজেদের জন্য আফসোস করতে দাও, তবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিটাও তাদেরই অর্জন করতে দাও, এটি প্রতিটি অভিভাবকের জন্য এক বড় শিক্ষা। তাই সন্তানকে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ দিন, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে দিন, তাদের আবেগগুলোকে সম্মান করুন এবং সব সময় বিচারক না হয়ে বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়ান।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন