জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও বেদনা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া একটি আবেগঘন পোস্টে তিনি কারিনার সাহস, মেধা ও অনন্য উপস্থিতির কথা স্মরণ করেন। একই সাথে কারিনার অসুস্থতার সময় অনলাইনে কিছু মানুষের ঘৃণ্য ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন।
শুক্রবার ভারতের ভেলোরের খ্রিষ্টান মেডিক্যাল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন কারিনা। লিভারের তীব্র জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা এই তরুণ প্রতিভার চলে যাওয়ায় দেশের বিনোদন ও সামাজিক মাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন, কারিনার সঙ্গে তার কখনো সরাসরি পরিচয় না হলেও লাখো মানুষের মতোই তিনি তাকে দেখতেন। বিশেষ করে একজন নারী হিসেবে এই সমাজে নিজের মুখ, শরীর, কণ্ঠ কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা কটু মন্তব্য ও আক্রমণের মুখোমুখি হয়েও যেভাবে কারিনা সাহসের সাথে নিজের অবস্থানে টিকে ছিলেন, তার প্রশংসা করেন জারা।
কারিনার রসবোধ ও সমাজ-সচেতনতার কথা উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, তিনি সেই ধরনের মানুষ ছিলেন, যাদের বুদ্ধিমত্তা থেকেই হাস্যরস তৈরি হয়। সমাজ নারীদের শরীর, কণ্ঠ ও স্বাধীন অবস্থানকে যেভাবে বিচার করে, কারিনা সেসব বিষয়কে নিজের কনটেন্টে তুলে ধরতেন এবং মানুষকে হাসাতেন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে যে বিষয়গুলো নিয়ে কারিনা হাস্যরস করতেন, সেগুলো নিয়ে হাসতে মেরুদণ্ড লাগে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কারিনার অপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে তাসনিম জারা বলেন, আমরা তার জীবনের মধ্যভাগ ও শেষ অধ্যায় দুটো থেকেই বঞ্চিত হলাম। প্রকৃত মেধাবীরা সবসময় নিজেদের পরবর্তী কাজের মধ্য দিয়ে আরও বড় হয়ে ওঠেন, কারিনারও সেই সম্ভাবনা ছিল।
পোস্টে তাসনিম জারা একটি বেদনাদায়ক প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। কারিনা যখন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এবং তার পরিবার কঠিন সময় পার করছিল, তখনও কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে তার অসুস্থতাকে ‘সৃষ্টিকর্তার শাস্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের কুৎসিত আচরণকে দেশের মানুষের এক ‘আহত মানসিকতার’ প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন জারা। তবে এই সব ঘৃণার চেয়ে কারিনা অনেক উঁচুতে ছিলেন বলে তিনি মনে করেন।
পোস্টের শেষে তাসনিম জারা লেখেন, কারিনার সাথে কখনো দেখা না হওয়ার আফসোস তার থেকে যাবে। দেখা হলে হয়তো বলতেন, ‘চালিয়ে যাও, এই দেশের তোমার মতো সাহসী মানুষের প্রয়োজন আছে।’ তবে তার বিশ্বাস, কারিনা অল্প জীবনেই অনেকের চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে গেছেন। পোস্টে তিনি যোগ করেন, ‘বিশ্রাম নাও, কারিনা। তোমার কারণে আমরা একটু বেশি সাহসী হওয়ার চেষ্টা করব।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হলেও পরে কারিনার শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ধরা পড়ে। হেপাটাইটিস এ ও ই-জনিত জটিলতায় তার লিভার ফেইলিউর হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কারিনার বাবা কায়সার হামিদ জানান, ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ রক্তচাপ অনেক নিচে নেমে যায়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণ দর্শকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া কারিনা সাম্প্রতিক সময়ে অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘ইন্টার্নশিপ’ এবং ‘৩৬-২৪-৩৬’।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন