হাম নির্মূলে সরকারের বড় পদক্ষেপ

৩০ উপজেলায় শুরু হচ্ছে বিশেষ টিকাদান অভিযান

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
৩০ উপজেলায় শুরু হচ্ছে বিশেষ টিকাদান অভিযান

দেশে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। আগামীকাল রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশের ১৮টি জেলার সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় একযোগে এই বিশেষ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। 

শনিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা প্রমাণের এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই কর্মসূচিকে। বিশেষ করে গত বছর ২০২৫ সালে টিকাদান কার্যক্রমে যে স্থবিরতা বা গাফিলতির অভিযোগ ছিল, তা কাটিয়ে উঠে শিশুদের জীবন বাঁচাতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, রোববার সকাল ৯টা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। তিনি নিজে এই কার্যক্রম তদারকি করতে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা সফর করবেন। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের এই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের একটি বড় অংশই হলো ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী। তাই এই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। শিশুটি আগে টিকা পেয়ে থাকুক বা না থাকুক, এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় তাকে পুনরায় ডোজ প্রদান করা হবে। যারা বর্তমানে অসুস্থ বা হামে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাদের বিশেষ ব্যবস্থায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল প্রদান করা হবে।

সংক্রমণের তীব্রতা বিচার করে স্বাস্থ্য বিভাগ দেশের ৩০টি উপজেলা ও সংশ্লিষ্ট পৌরসভাকে এই ধাপের জন্য নির্বাচন করেছে। তালিকায় থাকা এলাকাগুলো হলো বরগুনা জেলার সদর উপজেলা ও পৌরসভা। পাবনা জেলার সদর, পৌরসভা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া। চাঁদপুর জেলার সদর, পৌরসভা ও হাইমচর। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও রামু। গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর, পৌরসভা, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট। নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া। ময়মনসিংহ জেলার সদর, ত্রিশাল ও তারাকান্দা। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ। নওগাঁ জেলার পোরশা। যশোর জেলার সদর ও পৌরসভা। নাটোর জেলার সদর ও পৌরসভা। মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর, পৌরসভা, লৌহজং ও শ্রীনগর। মাদারীপুর জেলার সদর ও পৌরসভা। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ। ঝালকাঠি জেলার নলসিটি এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা যদি করোনার মতো বিশ্বব্যাপী মহামারিকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারি, তবে হামের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য কঠিন কিছু নয়। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা গুজব বা আতঙ্কে কান না দিয়ে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে আসেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো তীব্র জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ ওঠা। অনেক সময় এর সাথে কাশি ও চোখ লাল হওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়। সময়মতো টিকা না নিলে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই এই বিশেষ ক্যাম্পেইন শিশুদের জন্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

২০২৫ সালে হামের টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছিল। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেশ সপ্রতিভ উত্তর দেন। তিনি বলেন, আমরা এখন কাজ করতে চাই। অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করে সময় নষ্ট করার চেয়ে বর্তমানে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের কাছে বড়। আমরা সামনের দিকে তাকাতে চাই এবং স্বাস্থ্য খাতে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনিক ব্যর্থতাগুলো কাটিয়ে উঠে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৩০টি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে টিকাদান কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদেরও এই কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে, সে জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে। পাঁচটি আলাদা টিম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে যাবে যাতে কোনো ধরণের অনিয়ম বা টিকার স্বল্পতা না দেখা দেয়।

আপনার শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে হলে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। টিকাদানের সময় স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান আপনার শিশু আগে টিকা পেয়েছে কিনা। টিকা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে শিশুর জ্বর আসতে পারে, এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর বিষয়ে কেন্দ্র থেকে পরামর্শ নিন। হাম নির্মূলের এই মহাযজ্ঞ সফল হলে দেশের শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোববার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত চলবে। সরকারের লক্ষ্য, একটি শিশুও যেন এই জীবনরক্ষাকারী টিকার বাইরে না থাকে।

জেএইচআর