মিয়ানমারে সহিংসতা

প্রথম ছয় মাসে ৩ হাজার ১২ জান্তা সেনা নিহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৩, ০৯:৫৯ এএম
প্রথম ছয় মাসে ৩ হাজার ১২ জান্তা সেনা নিহত

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মিয়ানমারে ৩ হাজারের বেশি জান্তা সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক সরকারবিরোধী ছায়া সরকার বলে পরিচিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)।

তাদের দাবি, বিপুল সংখ্যক এই প্রাণহানি ছাড়াও ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে আরও চার হাজার জান্তা সেনা আহত হয়েছেন। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী।

২০২১ সালের ফেব্রয়ারি মাসের শুরুতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপর গণতন্ত্রের দাবিতে রক্তাক্ত সংগ্রামে লিপ্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বিরোধী দলগুলো গড়ে তোলে একটি সমান্তরাল সরকার, যেটি ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি নামে পরিচিত।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে আসছে এনইউজি। আর এই কারণে এটি মিয়ানমারের সামরিক সরকারবিরোধী ছায়া সরকার বলে পরিচিত।

দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে নিজেদের সশস্ত্র শাখা এবং বিদ্রোহী মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় মিয়ানমারের ৩ হাজার ১২ জন জান্তা সৈন্য নিহত এবং আরও ৪ হাজার ২১ জন সেনা আহত হয়েছেন বলে এনইউজি দাবি করেছে।

এনইউজি-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত জান্তা বাহিনী এবং এনইউজি-এর পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস ও সহযোগী সশস্ত্র সংস্থাগুলোর (ইএও) মধ্যে মোট ৯৩৫টি সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত দ্য ইরাবতীর এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সংঘর্ষে পিডিএফ গ্রুপ এবং মিত্র ইএও বাহিনী ৩০টিরও বেশি জান্তা ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন এনইউজি-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি উ মং মং সোয়ে। তিনি বলেছেন, দখলে নেওয়া এসব ঘাঁটির মধ্যে কায়াহ প্রদেশে ১০টি, সাগাইং অঞ্চলে ছয়টি এবং দেশের নিম্নাঞ্চলে ১৯টি ঘাঁটি রয়েছে।

এছাড়া সংঘর্ষের সময় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো জান্তা সরকারের ১৫টি পুলিশ স্টেশন এবং জান্তার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১০টি ফাঁড়িও দখল করে নেয়। একইসঙ্গে জান্তাপন্থি পিউ সাউ হতি নামক একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর ১৪টি ঘাঁটিও দখল করে নেওয়ার দাবি করেছে এনইউজি।

এদিকে বছরের প্রথম ছয় মাসে জান্তা ঘাঁটি এবং সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ২৫৫টি ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো। এছাড়া সংঘর্ষের সময় ৩০ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ এবং প্রায় ৮০০টি বিস্ফোরক ডিভাইসের পাশাপাশি ২০৩টি সামরিক-গ্রেডের অস্ত্রও জব্দ করে প্রতিরোধ বাহিনী।

সংবাদমাধ্যম ইরাবতী অবশ্য স্বাধীনভাবে এনইউজির এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

এদিকে সংঘর্ষের সময় জান্তা সেনাদের হামলায় ঠিক কী পরিমাণ প্রতিরোধ যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন তার সংখ্যা প্রকাশ করেনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে একই সময়কালে অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সংঘর্ষ এবং সরকারি বাহিনীর অভিযানের সময় অসংখ্য প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

শুধুমাত্র কায়াহ প্রদেশেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২২২টি সংঘর্ষে ৬৬৭ জন সরকারি সেনা এবং ৯৯ জন প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে প্রগ্রেসিভ কারেনি পিপল ফোর্স (পিকেপিএফ) জানিয়েছে। জাতিগত এই মানবাধিকার গোষ্ঠীটি ওই প্রদেশে সরকারের নৃশংসতা পর্যবেক্ষণ করে থাকে।  

এছাড়া স্থল সংঘর্ষের জবাবে জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে জান্তা বাহিনী ওই প্রদেশে বেসামরিক এবং প্রতিরোধ বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে ৩৩৮টি বিমান হামলা চালিয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, লড়াইরত প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো ইয়াঙ্গুন, বাগো, মান্দালেই এবং ম্যাগওয়ে অঞ্চলে অবস্থিত পাঁচটি জান্তা বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে এবং মিয়ানমারের সাতটি জান্তা অস্ত্র কারখানায় ১২টি হামলা চালিয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব সামরিক কমান্ডের সদর দপ্তরসহ পাঁচটি সামরিক বিভাগের অবকাঠামোগুলোতে ১৩টি বোমা হামলা চালিয়েছে।

উ মং মং সোয়ে বলেছেন, ‘২০২৩ সালের শুরু থেকে জান্তার ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ শুরুর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় সামরিক কমান্ড এবং ডিভিশনের ঘাঁটিতে থাকা সরকারি বাহিনীও এখন আর তাদের ঘাঁটিতে নিরাপদ বোধ করছে না।’

তিনি বলেন, পিডিএফ এবং ইএও শিগগিরই সরকারি বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে আরও আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছে।

দ্য ইরাবতী বলছে, পিডিএফ এবং ইএও গোষ্ঠীগুলো সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ অব্যাহত রাখার কারণে জান্তা সরকার ও বাহিনী এখন প্রতিদিনই ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এছাড়া গত জুনের শেষের দিক থেকে শান এবং কাচিন প্রদেশে আরও অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টায় ক্রমবর্ধমান হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে এসব গোষ্ঠী।

এইচআর