নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ৩৪ বছর বয়সী গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক নেতা জোহরান মামদানি। সিটি হলে বর্ণাঢ্য অভিষেক অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে পূর্ববর্তী মেয়র এরিক অ্যাডামসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদেশ রদ করেছেন। বিশেষ করে ইসরায়েল বয়কট নিষিদ্ধ করা এবং অ্যান্টিসেমিটিজম বা ইহুদি-বিদ্বেষের সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করার যে পদক্ষেপ অ্যাডামস নিয়েছিলেন, মামদানি তা বাতিল করে দিয়েছেন।
মেয়র মামদানির এই পদক্ষেপ নিউ ইয়র্কের ইহুদি নেতৃত্ব এবং প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে যখন মানবাধিকার কর্মীরা একে স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো একে 'উদ্বেগজনক' হিসেবে অভিহিত করেছে।
১. কেন ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ?
মেয়র মামদানি বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন বাতিল আদেশগুলোতে স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন। তিনি এরিক অ্যাডামসের সেইসব নির্দেশনাই বাতিল করেছেন যা ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের পর স্বাক্ষরিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, এই তারিখেই সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামস কেন্দ্রীয়ভাবে অভিযুক্ত (ইন্ডিকেট) হয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মামদানি বলেন, ওই তারিখটি এমন একটি মুহূর্তের প্রতীক ছিল যখন অনেক নিউ ইয়র্কবাসী মনে করতে শুরু করেছিলেন যে বর্তমান রাজনীতিতে তাদের জন্য আর কিছু অবশিষ্ট নেই। যদিও অ্যাডামস তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবে সেই অভিযোগগুলো আদালত খারিজ করে দেয়, মামদানি মনে করেন ওই সময়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো জনমতের প্রতিফলন ছিল না।
২. ইসরায়েল বয়কট ও ইহুদি-বিদ্বেষের সংজ্ঞা: নতুন মেরুকরণ
সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামস তাঁর মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে দুটি বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, যা সরাসরি ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।
বিনিয়োগ প্রত্যাহার নিষিদ্ধকরণ: অ্যাডামসের আদেশে বলা হয়েছিল যে সিটি বা শহরের কোনো সংস্থা ইসরায়েল থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার বা বয়কট করতে পারবে না। মামদানি এটি বাতিল করেছেন।
ইহুদি-বিদ্বেষের নতুন সংজ্ঞা: অ্যাডামস ইহুদি-বিদ্বেষের সংজ্ঞাকে 'ইন্টারন্যাশনাল হোলোকাস্ট রিমেম্বারেন্স অ্যালায়েন্স' (আইএইচআরএ)-এর সংজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইসরায়েল রাষ্ট্রের সমালোচনা করাকেও অনেক সময় ইহুদি-বিদ্বেষ হিসেবে গণ্য করা হয়। মামদানি এটিও বাতিল করেছেন।
মামদানি যুক্তি দিয়েছেন যে, এই বিস্তৃত সংজ্ঞা ইসরায়েল সরকারের সমালোচনা করার অধিকারকে খর্ব করে। তিনি শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা নিউ ইয়র্কের ইহুদি নাগরিকদের এমনভাবে সুরক্ষা দেব যাতে মানুষের অধিকারও রক্ষিত হয়। অনেক ইহুদি সংগঠনও এই বিস্তৃত সংজ্ঞার বিষয়ে আমার মতোই উদ্বিগ্ন ছিল।
৩. অগ্রাধিকার তালিকায় আবাসন সংকট
ইসরায়েল ইস্যু ছাড়াও মামদানি তাঁর প্রথম দিনেই আবাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। আবাসন ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল ভিত্তি। তাঁর নতুন আদেশে দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
উন্নয়ন গতিশীল করা: আবাসন প্রকল্পগুলোর কাজ কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ করা।
খাস জমির তালিকা: সিটি বা শহরের মালিকানাধীন কোথায় কোথায় নতুন আবাসন নির্মাণ করা সম্ভব, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা এবং আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া।
সমালোচকরা মনে করেন, অ্যাডামস শেষ মুহূর্তে যেসব আদেশ দিয়েছিলেন তা মূলত মামদানির আবাসন ও প্রগতিশীল এজেন্ডাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল ছিল।
৪. রাইকার্স আইল্যান্ড এবং অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন
মামদানির এই সংস্কার অভিযানে যুক্ত হয়েছে নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের সমর্থন। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডোনা লিবারম্যান মেয়রের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মামদানি অ্যাডামস আমলের সেই আদেশটিও বাতিল করেছেন যা রাইকার্স আইল্যান্ড জেল কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে (আইসিই) প্রবেশাধিকার দিয়েছিল।
লিবারম্যানের মতে, অ্যাডামসের ওই আদেশ নিউ ইয়র্ক সিটির 'স্যাঙ্কচুয়ারি ল' বা আশ্রয় আইন লঙ্ঘন করেছিল এবং এটি ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের নিষ্ঠুর নির্বাসন নীতির জন্য একটি উপহার মাত্র।
৫. প্রতিক্রিয়ায় উত্তাল ইহুদি নেতৃত্ব ও ইসরায়েল
মেয়র মামদানির এই সিদ্ধান্ত আসার পরপরই ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে যে মামদানির এই পদক্ষেপ ইহুদি-বিদ্বেষকে উসকে দেবে।
নিউ ইয়র্কের বেশ কিছু প্রভাবশালী ইহুদি সংগঠন যেমন—ইউজেএ ফেডারেশন অব নিউ ইয়র্ক এবং নিউ ইয়র্ক বোর্ড অফ র্যাবাইস একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেছে যে, মামদানি ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাগুলো কমিয়ে দিয়েছেন। তবে তারা এই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে যে, মামদানি 'অফিস টু কমব্যাট অ্যান্টিসেমিটিজম' বা ইহুদি-বিদ্বেষ বিরোধী অফিসটি বন্ধ না করে কেবল এর পুনর্গঠন করছেন।
৬. মামদানির রাজনৈতিক দর্শন ও বিডিএস সমর্থন
জোহরান মামদানি একজন ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক এবং 'বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট, স্যাঙ্কশনস' (বিডিএস) আন্দোলনের সমর্থক। এই আন্দোলন ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার রক্ষায় ইসরায়েলের ওপর অহিংস অর্থনৈতিক চাপ তৈরির আহ্বান জানায়। যদিও সমালোচকরা একে ইহুদি-বিদ্বেষী বলে মনে করেন, মামদানির অবস্থান স্পষ্ট। তিনি ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারে বিশ্বাস করেন, তবে তিনি মনে করেন ইসরায়েল সরকারকে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
৭. মেয়রের ক্ষমতা এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ
নিউ ইয়র্ক সিটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে মেয়রের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা ন্যস্ত। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিনি কেবল প্রতীকী বার্তা দেন না, বরং শহরের প্রশাসনিক কাঠামো ও নীতিমালার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। মামদানির এই প্রথম পদক্ষেপগুলোই বলে দিচ্ছে যে, তাঁর প্রশাসন হবে প্রগতিশীল, মানবাধিকার কেন্দ্রিক এবং ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের জন্য একটি বড় আশার জায়গা।
তবে রিপাবলিকান পক্ষ এবং রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটদের প্রবল বিরোধিতার মুখে মামদানি তাঁর এই সংস্কার কর্মসূচিগুলো কতদূর এগিয়ে নিতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন