দীর্ঘদিনের সংঘাত ও প্রস্তুতি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং নারকো-টেরোরিজম বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন মাদুরোকে ধরার জন্য ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ বাড়তে থাকে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত আগস্ট মাস থেকেই মাদুরোর গতিবিধি এবং তাঁর অত্যন্ত সুরক্ষিত বাসভবন 'ফুয়ের্তে তিউনা'র নকশা নিয়ে কাজ শুরু করে।
যেভাবে পরিচালিত হলো সেই দুঃসাহসিক অভিযান ৩ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার ভোররাত। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট 'ডেল্টা ফোর্স' এক অতর্কিত হামলা চালায়। কারাকাসের সবচেয়ে সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি 'ফুয়ের্তে তিউনা' এবং লা কারলোটা বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে অকেজো করে দেওয়া হয়। ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা মাদুরোর একটি সেফ হাউস বা নিরাপদ দুর্গ থেকে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এটি ছিল একটি চমৎকার অভিযান। তিনি আরও দাবি করেন, মাদুরো একটি স্টিলের তৈরি সুরক্ষিত কক্ষে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মার্কিন সেনারা এতটাই দ্রুত ছিলেন যে তিনি দরজায় পৌঁছাতে পারেননি।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সামরিক সদস্য ছাড়াও সাধারণ বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন।
বিশেষ করে কারাকাস বিমানবন্দরের পশ্চিমে কাতিয়া লা মার এলাকায় একটি তিনতলা আবাসিক ভবনে হামলায় এক ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা ও তাঁর পুরো পরিবার নিহত হন। এছাড়া অভিযানে মাদুরোকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে তাঁর বেশ কিছু কিউবান দেহরক্ষী নিহত হয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন।
বন্দী মাদুরোর যাত্রা আটকের পর মাদুরোকে হেলিকপ্টারে করে ইউএসএস আইয়ো জিমায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রায় ২১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তাঁকে নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। মাদুরোকে বর্তমানে রাখা হয়েছে নিউইয়র্কের কুখ্যাত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি)।
এটি এমন এক কারাগার যেখানে এর আগে জেফরি এপস্টাইন বা র্যাপার পি ডিডির মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। হোয়াইট হাউস একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে যেখানে দেখা যায়, মাদুরো কালো হুডি পরে মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা ডিইএ-র করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান অবস্থা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার শাসনক্ষমতা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলার আদালত ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, রদ্রিগুয়েজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে চলেন, তবে সেখানে আর সেনা মোতায়েন করা হবে না। তবে রদ্রিগুয়েজ এক টেলিভিশন ভাষণে মাদুরোকে অপহরণ করার অভিযোগ তুলে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
মার্কিন হামলার পর ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সুপারমার্কেটগুলোতে খাদ্য মজুদ করার হিড়িক পড়েছে এবং জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে ইলন মাস্কের স্টারলিংক ভেনেজুয়েলাবাসীকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
দ্বিধাবিভক্ত বিশ্ব এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে স্যালুট জানিয়েছেন এবং একে সাহসী পদক্ষেপ বলেছেন। চীন ও রাশিয়া এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মাদুরোর অপসারণকে স্বাগত জানালেও যুক্তরাজ্য জানিয়েছে তারা এই অভিযানে সরাসরি যুক্ত ছিল না। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।
মার্কিন অন্দরে সমালোচনা অভিযানটি সফল হলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রবীণ সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স একে পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের সাথে তুলনা করেছেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জ্যাক অচিনক্লজ বলেছেন, এটি কোনো মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ দখল করার একটি পরিকল্পিত নীল নকশা। তাঁর মতে, ট্রাম্প মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় এই রক্তপাত ঘটিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিল। এটি কি গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার নাকি সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন আঘাত, তা নিয়ে বিতর্ক চলবে। তবে আপাতত বিশ্বের নজর এখন ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতের দিকে, যেখানে আগামী সপ্তাহে নিকোলাস মাদুরোর বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের হুশিয়ারি, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন