মার্কিন হামলায় উত্তাল বিশ্ব: এবার মুখ খুলল উত্তর কোরিয়া ও ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
মার্কিন হামলায় উত্তাল বিশ্ব: এবার মুখ খুলল উত্তর কোরিয়া ও ইরান

কারাকাসে মার্কিন হস্তক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ আখ্যা তেহরানের; ওয়াশিংটনকে দুর্বৃত্ত বলল পিয়ংইয়ং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনীর বড় আকারের হামলা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না উত্তর কোরিয়া। 

রোববার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ-এর এক প্রতিবেদনে পিয়ংইয়ংয়ের কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়। 

উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সবচেয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপ। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি দুর্বৃত্ত এবং নৃশংস স্বভাবের রাষ্ট্র। কিম জং উনের সরকার এই ঘটনাকে বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে ওয়াশিংটনের আধিপত্যবাদী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে।

ইরানের সংহতি ও অপহরণ বিতর্ক এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর দেশ ইরান এই ঘটনাকে স্রেফ সামরিক অভিযান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অপহরণ হিসেবে দেখছে। রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল পিন্তোর সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেন। 

ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, আরাঘচি এই নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন বৈধ প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই সংকটে তারা ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং নির্বাচিত সরকারের পাশে থাকবে। ইরান মনে করে, ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের দখলদারি কায়েম করতে চাইছে।

এক নজরে ৩ জানুয়ারি ভোরে মার্কিন এলিট ফোর্স ডেল্টা ফোর্স কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরো দম্পতিকে আটক করে। নিকোলাস মাদুরোকে বর্তমানে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তাঁর বিচার শুরু হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা চালাবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে আরও সেনা মোতায়েনের হুমকি দিয়েছেন তিনি। ভেনেজুয়েলার আদালত ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলেও, তিনি মার্কিন এই পদক্ষেপকে অবৈধ এবং আগ্রাসন বলে দাবি করে মাদুরোর মুক্তি চেয়েছেন।

ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একজোট মিত্ররা ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি বিশ্বকে দুটি শিবিরে বিভক্ত করে ফেলেছে। একদিকে মার্কিন মিত্র দেশগুলো এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো একে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের এই কড়া প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। 

মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের একাংশ যেমন দাবি করছেন, এই হামলার পেছনে মাদক পাচার নয় বরং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুত দখল করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। ইরান ও উত্তর কোরিয়াও প্রকারান্তরে সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেই সরব হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্য কোনো শক্তিশালী দেশের জন্য অন্য রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের একটি বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা শুধু কারাকাসের শাসন পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। উত্তর কোরিয়া ও ইরানের এই অবস্থান যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে। 

এখন দেখার বিষয়, সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এই দেশগুলোর মিত্ররা অর্থাৎ রাশিয়া ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি লাতিন আমেরিকাকে শান্ত করবে নাকি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

জেএইচআর