ইরানের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা রাজপথে নেমে এসেছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই উত্তাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের চিরবৈরী দুই দেশ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল এখন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে ইরানের শাসকদের লক্ষ্য করে একাধিকবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ না করতে ইরান সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে শনিবার তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের এই সহায়তার প্রচ্ছন্ন হুমকি মূলত সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের বর্তমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে তারা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। সপ্তাহান্তে ইসরায়েলের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকে এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। যদিও সর্বোচ্চ সতর্কতার কৌশলগত বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান যদি দেশের ভেতরকার জনবিক্ষোভ থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতে ইসরায়েলে হামলা চালায়, তবে তেল আবিব পাল্টা ভয়াবহ আক্রমণ চালাবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি সেরে রাখছে ইসরায়েল।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও তোড়জোড় শুরু হয়েছে। শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। একটি ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, তাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের রূপরেখা। ওয়াশিংটন অবশ্য ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার স্পর্শকাতর বিষয়বস্তু নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ইরানের বিক্ষোভ চলাকালীন ইসরায়েল সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত না দিলেও, ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তাদের উদ্বেগ চরমে। সম্প্রতি দি ইকোনমিস্ট সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু ইরানকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর কোনো ধরনের আঘাত হানার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার পরিণতি হবে অকল্পনীয় ও ভয়াবহ। বর্তমানে ইরানের ভেতরে যা ঘটছে, তা আমাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ইরানের ভেতরে চলমান এই গণজাগরণ কেবল তেহরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। বিক্ষোভকারীরা যানবাহনে আগুন দিচ্ছে এবং সরকারের পতন দাবি করছে, এমন দৃশ্যগুলো শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান সরকার যদি মনে করে যে এই আন্দোলনের পেছনে বিদেশি ইন্ধন রয়েছে, তবে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে পারে। ইরানের জ্বলন্ত রাজপথ এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
একদিকে মার্কিনীদের সরাসরি সহায়তার প্রস্তাব, অন্যদিকে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সামরিক সতর্কতা, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিশাল বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেহরানের শাসকদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দেবে এই অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইবে নাকি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা হবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন