ইরানে গ্রেপ্তারের সাতদিনের মাথায় ফাঁসি হতে পারে তরুণ বিক্ষোভকারী এরফানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
ইরানে গ্রেপ্তারের সাতদিনের মাথায় ফাঁসি হতে পারে তরুণ বিক্ষোভকারী এরফানের

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাস থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী তরুণ এরফান সোলতানি আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াতে পারেন। গত বৃহস্পতিবার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত—সাত দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁর গ্রেপ্তার, বিচার এবং দণ্ড কার্যকরের এই দ্রুততম প্রক্রিয়াকে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার এরফান সোলতানিকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। ওই সময় কারাস শহরে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছিল এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছিল।

গ্রেপ্তারের পর এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে এরফানের বিচার সম্পন্ন করা হয়, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং আজ বুধবার তাঁর সাজা কার্যকরের দিন ধার্য করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক গতির বিচার প্রক্রিয়াকে ‘প্রহসন’ বলে দাবি করছে হেনগো, যারা ইরান ও কুর্দিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১১ জানুয়ারি ইরানি কর্মকর্তারা এরফানের পরিবারকে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর থেকে এরফান তাঁর প্রিয়জনদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারেননি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর কড়াকড়িতে তাঁর পরিবার আইনি সহায়তা পাওয়ারও কোনো সুযোগ পায়নি।

এরফানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ আবারও ভিন্নমত দমন করার জন্য দ্রুত বিচার ও নির্বিচার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ বেছে নিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তারা মনে করছে, জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতেই এত দ্রুত দণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২০২২ সালের পর বর্তমান ইরান সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করছে। মূলত লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও চরম আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং বিক্ষোভকারীরা ইরানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর অবসান দাবি করে স্লোগান দিতে শুরু করে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির একটি বড় অংশে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

গতকাল (মঙ্গলবার) ইরানের একজন সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। গত সপ্তাহেই দেশজুড়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদেরই একজন ছিলেন এই হতভাগা তরুণ এরফান সোলতানি। ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে আসছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, চীনের পর ইরানেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। নরওয়েভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ইরান হিউম্যান রাইটস গ্রুপ' জানিয়েছে, গত বছর ইরানে অন্তত ৫০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই এরফানের মতো তরুণদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনা এই পরিসংখ্যানকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার আগে কারাস শহর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, সেখানে বিক্ষোভ ছিল তুঙ্গে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করছে। এরফানকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সেই আন্দোলনের জোয়ার থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির জীবন এখন সুতার ওপর ঝুলছে। আজ ভোরের আলো ফোটার পর থেকে যেকোনো মুহূর্তে তেহরানের কোনো এক কারাগার থেকে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যাতে এই ‘আইনি হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ করা যায়। এরফানের এই দণ্ড কার্যকর হলে তা ইরানের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে আরও একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।

এএন