আগ্নেয়গিরির মুখে তেহরান: খামেনির সাম্রাজ্যে ভাঙনের সুর ও ইরানের সম্ভাব্য গন্তব্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
আগ্নেয়গিরির মুখে তেহরান: খামেনির সাম্রাজ্যে ভাঙনের সুর ও ইরানের সম্ভাব্য গন্তব্য

ইরানের রাজপথ এখন জনশূন্য, কিন্তু এই নিস্তব্ধতা কি শান্তির নাকি বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস? ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বর্তমান অবস্থাকে বিশ্লেষকরা একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির সঙ্গে তুলনা করছেন। উপরে দমন-পীড়নের কঠিন আবরণ থাকলেও ভেতরে বইছে লাভার মতো উত্তপ্ত জনক্ষোভ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান কখনোই এমন অস্তিত্ব সংকটে পড়েনি। একদিকে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রভাব বলয় ভেঙে পড়া—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পারস্য উপসাগরের এই দেশটি।

গত কয়েক মাসে ইরানের রাজপথে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলেছিল, তা আপাতদৃষ্টে নিরাপত্তা বাহিনীর বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে, অনেকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছে এবং কড়া নজরদারিতে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু এই ‘নিয়ন্ত্রিত’ পরিস্থিতির অন্তরালে লুকিয়ে আছে গভীর হতাশা।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সংকট। মুদ্রার রেকর্ড দরপতন থেকে যে অসন্তোষের জন্ম হয়েছিল, তা এখন খোদ শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার সংকল্পে রূপ নিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে যে কয়েক হাজার প্রাণ ঝরেছে (মানবাধিকার কর্মীদের মতে ৫ হাজারের বেশি), সেই রক্তের দাগ ইরানের সামাজিক কাঠামোতে এক স্থায়ী ফাটল তৈরি করেছে।

ইরানের অর্থনীতির এখন ত্রাহি মধুসূদন দশা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ৪২ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এক দশক আগের পরমাণু চুক্তির সময়ের তুলনায় যা কয়েক গুণ বেশি।

রিয়ালের পতন: ইরানি রিয়াল এখন প্রায় মূল্যহীন কাগজে পরিণত হয়েছে।

জ্বালানি ও পানির সংকট: খনিজ সম্পদের দেশ হয়েও অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে জনগণকে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে নাকাল হতে হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তেল রপ্তানিকে প্রায় তলানিতে নামিয়ে এনেছে।

ইরান এতদিন তার ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ বা আগাম প্রতিরক্ষা কৌশলের ওপর ভর করে চলত। অর্থাৎ যুদ্ধ যেন ইরানের সীমানায় না পৌঁছায়, সেজন্য তারা সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকে মিত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন:

সিরিয়া ও লেবানন: সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি নড়বড়ে হয়ে যাওয়া ইরানের আঞ্চলিক দাপটকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।

ইসরায়েলের সরাসরি আঘাত: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি বাহিনী সরাসরি ইরানের ভেতরে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে, যা তেহরানের নিরাপত্তার বড়াইকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনকাল তেহরানের জন্য নতুন এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি ইরানকে এক চরম সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সামনে এখন দুটি কঠিন পথ:

চরম আপস: পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সহায়তা বন্ধ করে আমেরিকার শর্ত মেনে আলোচনায় বসা। যা করলে খামেনির দীর্ঘদিনের আদর্শিক ভিত ধসে পড়বে।

বিদ্রোহের ঝুঁকি: কঠোর অবস্থান ধরে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ আরও বড় গণ-অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত থাকা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়াতুল্লাহ খামেনি এখন এমন এক গোলকধাঁধায় পড়েছেন যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়া মানেই নিজের তৈরি নিরাপত্তার দুর্গ ভেঙে ফেলা।

ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রেও এখন বড় ধরনের রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসলামি স্কলার বা ধর্মতাত্ত্বিক নেতৃত্বের হাত থেকে ক্ষমতা ধীরে ধীরে ‘রেভোল্যুশনারি গার্ডস’ বা আইআরজিসি-র (IRGC) হাতে চলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলীরেজা আজিজির মতে, আইআরজিসি এখন কেবল একটি মিলিশিয়া বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক।

খামেনি-পরবর্তী যুগে ইরান হয়তো আর বর্তমানের ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ থাকবে না। এর রূপ হতে পারে উত্তর কোরিয়া স্টাইলের সামরিক শাসন অথবা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো আকস্মিক পতন।

ইরান আজ ইতিহাসের এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে ‘পরিবর্তন’ এখন আর কোনো সম্ভাবনা নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিনিময়ে নিরাপত্তার যে সামাজিক চুক্তি সরকার করেছিল, তা আজ অকার্যকর। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ আর নিরাপত্তার অভাব যখন একত্রিত হয়, তখন কোনো দমন-পীড়নই চিরস্থায়ী হয় না। আয়াতুল্লাহ খামেনির সময় ফুরিয়ে আসছে, আর বিশ্ব এখন চেয়ে দেখছে ইরান কি নিজেকে সংস্কার করবে নাকি ধ্বংসের পথে হাঁটবে।

এএন