বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে আবারও ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধের কালো মেঘ। দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
সিএনএন-সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পেন্টাগন ইরানে সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহের শেষভাগেই শুরু হতে পারে এই অভিযান। তবে চূড়ান্ত নির্দেশনার কলকাঠি এখনও হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ আটকা পড়ে আছে।
গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে শক্তি বৃদ্ধিতে কোনো কমতি রাখেনি পেন্টাগন। সামরিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক পারমাণবিক চালিত বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড’ এ সপ্তাহান্তেই পারস্য উপসাগরের উপকূলে নোঙর করতে যাচ্ছে।
কেবল সমুদ্রপথ নয়, আকাশপথেও ঘেরাও করা হচ্ছে ইরানকে। যুক্তরাজ্যে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং রিফুয়েলিং ট্যাংকারগুলোকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অবস্থানের কাছাকাছি।
হোয়াইট হাউসকে সামরিক বাহিনী সাফ জানিয়ে দিয়েছে অস্ত্রাগার প্রস্তুত, লক্ষ্যবস্তু স্থির; এখন শুধু প্রেসিডেন্টের একটি সই বা মৌখিক নির্দেশের অপেক্ষা।
এদিকে মার্কিন রণপ্রস্তুতির বিপরীতে হাত গুটিয়ে বসে নেই তেহরানও। ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’র সর্বশেষ স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরান তাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে রক্ষার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
মাটির নিচে থাকা এই স্থাপনাগুলোকে আরও সুরক্ষিত করতে কয়েক স্তরের বিশেষ কনক্রিট ও মাটির আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। তেহরানের এই তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা সম্ভাব্য বড় ধরনের বিমান বা মিসাইল হামলার আশঙ্কা করছে।
বুধবার হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত গোপনীয় ‘সিচুয়েশন রুমে’ জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তাকে ব্রিফ করেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তারা জেনেভায় ইরানের সঙ্গে হওয়া পরোক্ষ আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
যদিও সেই আলোচনায় কোনো সমাধানসূত্র মেলেনি, তবুও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন,‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেন, তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক পথ পুরোপুরি খোলা রাখা হয়েছে।’
সামরিক প্রস্তুতি থাকলেও হামলার সঠিক সময় নির্ধারণে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় ইস্যু ট্রাম্পকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশ্লেষকরা তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন যা হামলার দিনক্ষণ পিছিয়ে দিতে পারে।
আগামী রোববার শীতকালীন অলিম্পিক শেষ হতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো চায় না এই বৈশ্বিক ক্রীড়া উৎসব চলাকালীন বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হোক।
গতকাল বুধবার থেকেই মুসলিম বিশ্বে পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো রমজান মাসে কোনো সামরিক অভিযানের ঘোর বিরোধিতা করছে। এই সময়ে হামলা চালালে মুসলিম দেশগুলোর জনমত ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
আগামী মঙ্গলবার ট্রাম্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ রয়েছে। এই ভাষণের আগে যুদ্ধে জড়ানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকি হতে পারে কি না, তা নিয়ে খোদ ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মধ্যেই মতভেদ আছে।
যদি সত্যিই চলতি সপ্তাহের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় নামতে পারে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ট্রাম্প কি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির হাত ধরবেন, নাকি তার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় সামরিক জুয়া খেলবেন সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন