ইরানের মাটিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের মধ্যেই এক বিস্ফোরক রাজনৈতিক চাল চাললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কেবল সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ নয়, বরং তেহরানের কয়েক দশকের ধর্মীয় নেতৃত্বের শাসনব্যবস্থা চিরতরে উপড়ে ফেলার প্রকাশ্য ডাক দিয়েছেন তিনি।
এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানি জনগণকে এই সামরিক অভিযানকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
শনিবার বিকেলে প্রচারিত এক ভিডিও বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ইরানের সাধারণ মানুষের উদ্দেশে কথা বলেন। তিনি চলমান যৌথ সামরিক অভিযানকে ইরানিদের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের এই সামরিক অভিযান যখন শেষ হবে, তখন আপনারা নিজেদের সরকার নিজেরা দখলে নিন। এটি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে এটাই আপনাদের একমাত্র সুযোগ নিজেদের মুক্তি ছিনিয়ে নেওয়ার।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য কেবল যুদ্ধের ঘোষণা নয়, বরং এটি ইরানে একটি অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর প্রকাশ্য প্ররোচনা।
ট্রাম্প কেবল সাধারণ মানুষ নয়, বরং ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রতিও একটি ভীতিকর ও সরাসরি বার্তা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যারা বর্তমান শাসনের পক্ষ হয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের জন্য কেবল ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ অপেক্ষা করছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘অস্ত্র ফেলে দিলে আপনাদের মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু যারা অস্ত্র ছাড়বেন না, তারা আমাদের সামরিক শক্তির সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন।‘এই আল্টিমেটামের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ফাটল ধরাতে এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ রক্তপাত। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ৬ হাজার ৪৮০ জন মানুষকে হত্যা করেছে।
তখনই ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইরান সরকারকে ‘বড় মূল্য’ দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেছিলেন, ‘সহায়তা পথে রয়েছে’। আজকের এই যৌথ হামলা এবং ট্রাম্পের ভিডিও বার্তা সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও মাঝে কিছুদিন পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কারণে ট্রাম্পের সুর কিছুটা নরম ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ‘রিজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের পথেই হাঁটলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে উল্লাস প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পকে ‘মহান বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন,‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর তৈরি করা ৪৭ বছরের হুমকির অবসান ঘটাবে। নেতানিয়াহু আরও মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে আয়াতুল্লাহ শাসিত ইরান ‘আমেরিকার মৃত্যু’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগান দিয়ে আসছে। আজ সেই হুমকির উৎস নির্মূল করার চূড়ান্ত সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এই সরাসরি অভ্যুত্থানের আহ্বান বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নেতা ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একমত হলেও, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানানোকে বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছেন। রাশিয়া ও চীন ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
অন্যদিকে, তেহরানের রাজপথে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ট্রাম্পের এই আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশটিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বার্তা কেবল ইরানকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার একটি মহাপরিকল্পনার অংশ। তিনি চাইছেন ইরানের অভ্যন্তরীণ জনরোষকে সামরিক শক্তির সাথে যুক্ত করে একটি 'পুতুল সরকার' বা অন্তত মিত্র সরকার গঠন করতে। তবে ইরানিদের দেশপ্রেম এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের গভীরতা এই পরিকল্পনাকে কতটা সফল হতে দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন