একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আর নেই।
শনিবার সকালে রাজধানী তেহরানে নিজ কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এই তথ্য নিশ্চিত করার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ১ মার্চ থেকে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে তার প্রশাসনের এক বিশাল বিজয় হিসেবে দেখছেন। হামলার পর এক বিবৃতিতে ট্রাম্প তিনটি প্রধান লক্ষ্যের কথা স্পষ্ট করেছেন।
১. পারমাণবিক হুমকি নির্মূল: ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া।
২. সামরিক মেরুদণ্ড ভাঙা: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নৌবাহিনীকে অকেজো করা।
৩. শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন: আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করা।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খামেনির বাসভবন ও সংলগ্ন কার্যালয় চত্বরটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। হামলায় শুধু খামেনিই নন, বরং ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ডের (IRGC) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরও নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে দেশটির সংবিধানে এমন সংকটকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, একটি তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের পরিষদ আপাতত রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করবে। এই পরিষদে থাকছেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা।
এই পরিষদটিই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এবং ইসরাইলি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নজরদারির মধ্যে এই পরিষদের সদস্যদের এক জায়গায় মিলিত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে দ্রুত উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
খামেনি নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ইরান তার পাল্টা জবাব শুরু করেছিল। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরানি বাহিনী। বিশেষ করে বাহরাইনের মার্কিন ৫ম নৌবহরের সদর দফতরে হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ আজ এক ভয়াবহ প্রশ্নের মুখোমুখি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব কি কেবল ক্ষমতার বড়াইয়ের কাছে নতিস্বীকার করবে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক আগুনের কুণ্ডলীতে নিক্ষেপ করেছে যেখান থেকে কারো পক্ষেই অক্ষত বের হওয়া সম্ভব নয়। ফিলিস্তিনের গাজা ধ্বংসের পর এখন ইরানের ওপর এই মরণকামড় বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু মানেই যুদ্ধের শেষ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। যদি ইরান তার প্রক্সি বাহিনীগুলোকে (হিজবুল্লাহ, হুথি ও অন্যান্য) সক্রিয় করে তোলে, তবে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
ইরান এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে খামেনির শূন্যস্থান পূরণ করার চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলা। রাশিয়া ও চীন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানালেও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে তারা কতটা এগিয়ে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন