এক উত্তপ্ত সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশীদের জন্য বিশেষ এক শান্তি বার্তা পাঠালেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
শনিবার তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত এক বিশেষ ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে যদি কোনো প্রতিবেশী দেশ থেকে ইরানের ওপর সরাসরি হামলা না হয়, তবে তেহরান সেসব দেশে আর কোনো পাল্টা আক্রমণ বা মিসাইল হামলা চালাবে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর চলমান অস্থিরতায় এই বক্তব্যকে তেহরানের এক কৌশলগত মোড় পরিবর্তন এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা প্রশমনের বড় ধরনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভাবনীয় মোড় নেয় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। অপারেশন এপিক ফিউরি নামে পরিচিত এই হামলায় তেহরানের সুরক্ষিত বাসভবনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সপরিবারে নিহত হন।
একই সাথে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বা আইআরজিসি এর শীর্ষস্থানীয় কমান্ডিং অফিসারদের একটি বড় অংশ নির্মূল হয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং পাল্টা প্রতিশোধ নিতে ইরান ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
বিশেষ করে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে ইরানের এই মুহুর্মুহু হামলা ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অষ্টম দিনে এসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন যে গতকাল ৬ মার্চ ইরানের নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন দিয়েছে। এই কাউন্সিল বর্তমানে আয়াতুল্লাহ খামেনির অবর্তমানে দেশটির নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
ভাষণে তিনি বলেন, আমরা গত কয়েক দিনে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যে সামরিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে আশ্বস্ত করতে চাই যে ইরান তাদের শত্রু নয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল কেবল বিদেশি আগ্রাসীদের ঘাঁটি। কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে যদি কোনো দেশ থেকে ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত না আসে, তবে আমরা সেসব দেশে আর কোনো মিসাইল ছুড়ব না। পেজেশকিয়ান আরও দাবি করেন যে প্রতিবেশীদের ওপর হওয়া কিছু হামলা মূলত যোগাযোগের বিভ্রাট বা মাঠপর্যায়ের ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে, যা তেহরান এখন বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।
এদিকে ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে ইরানের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানিয়েছেন। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে বলেছেন যে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে, অন্যথায় তেহরান এমন এক সামরিক শক্তির মুখোমুখি হবে যা পৃথিবী এর আগে কখনো দেখেনি।
ট্রাম্পের এই কঠোর বার্তার জবাবে পেজেশকিয়ান সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি একটি স্বপ্ন মাত্র এবং মার্কিন প্রশাসনকে এই স্বপ্ন নিয়েই কবরে যেতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে ইরান শান্তির জন্য প্রস্তুত, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।
গত এক সপ্তাহে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বাহরাইন, কাতার এবং কুয়েতের আকাশপথ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ছিল। এছাড়া বাহরাইনের তেল শোধনাগার এবং আবুধাবির বেন জায়েদ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
কাতার, তুরস্ক ও ওমান ইতিমধ্যে সংঘাত থামানোর জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। আরব দেশগুলো বারবার অভিযোগ করে আসছিল যে ইরান ও ইসরাইল আমেরিকা দ্বন্দ্বে তাদের ভূমিকে রণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের আজকের এই বার্তা মূলত ওই দেশগুলোর ক্ষোভ প্রশমনের একটি বড় পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমানে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করছে। অভ্যন্তরীণভাবে খামেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে নেতৃত্বের শূন্যতা ও ব্যাপক বিক্ষোভ দানা বাঁধছে এবং অন্যদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ দেশটির সামরিক অবকাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই অবস্থায় যদি প্রতিবেশী আরব দেশগুলো সরাসরি ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তবে তেহরানের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিয়ে ইরান মূলত আরব দেশগুলোর সাথে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর রসদ সরবরাহ ও গোয়েন্দা তথ্য আদান প্রদান সীমিত করার কৌশল গ্রহণ করেছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বার্তা কি আসলেই যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত করবে নাকি এটি কেবল সামরিক শক্তিতে আবার বলীয়ান হওয়ার একটি সময়ক্ষেপণ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইসরাইলের ক্রমাগত বিমান হামলার মুখে ইরানের এই আঞ্চলিক শান্তির প্রস্তাব কতটা টেকসই হয় তা দেখার বিষয়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ যারা গত সাত দিন ধরে বোমা আর সাইরেনের শব্দে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের কাছে এটি অন্তত একটি ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির বার্তা। তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে মার্কিনীদের পরবর্তী হামলার ওপর এবং যদি আমেরিকা ও ইসরাইল পুনরায় তেহরানে আঘাত হানে, তবে এই শান্তির প্রস্তাব মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন