সৌদি আরবের এভিয়েশন ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করল বিশ্ব। বুধবার জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম এবং মদিনার মতো প্রধান চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একযোগে ১২৮টি ফ্লাইট বাতিল এবং ৪২২টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে।
এই নজিরবিহীন শিডিউল বিপর্যয়ের ফলে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে 'সাউদিয়া', 'ইন্ডিগো' এবং 'কাতার এয়ারওয়েজ'-এর মতো বড় সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার অচল হয়ে পড়েছে।
আজকের এভিয়েশন সংকটে সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদের প্রধান দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৭টি ফ্লাইট বাতিল এবং ১৬৮টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বিলম্বের ঘটনা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একক বিমানবন্দর হিসেবে সর্বোচ্চ ৪৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং সেখানে আরও ১৫৪টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। এছাড়া দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৪টি ফ্লাইট বাতিল ও ৬৩টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। পবিত্র শহর মদিনার প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৯টি ফ্লাইট বাতিল এবং ৩৭টি ফ্লাইট বিলম্বের ঘটনা ঘটেছে।
আজকের এই সংকটে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে সৌদির জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা সাউদিয়া (Saudia)। তারা একাই ৩৪টি বাতিল এবং ৮০টি বিলম্বিত ফ্লাইটের কবলে পড়েছে।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইনসও ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের কারণে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সৌদিভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইনাসের সর্বোচ্চ ১৪৯টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। একইভাবে স্বল্পমূল্যের আরেক সৌদি এয়ারলাইনস ফ্লাইডিলের ৯৩টি ফ্লাইট দেরিতে চলাচল করছে। ভারতের জনপ্রিয় বিমান সংস্থা ইন্ডিগো সৌদি আরবে নির্ধারিত তাদের ২৬টি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় বিমান সংস্থা কাতার এয়ারওয়েজও ৩১টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এছাড়া ইজিপ্ট এয়ারের পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং গালফ এয়ার, কেএলএম ও পেগাসাস এয়ারলাইনসসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাইটের সময়সূচি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
যদিও আজকের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে গত কয়েকদিনের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আকাশপথ অবরুদ্ধ হওয়া এবং ড্রোন হামলার আশঙ্কা এই গণ-বাতিল ও বিলম্বের নেপথ্য কারণ বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ড্রোনের আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা সতর্কতার কারণে অনেক সময় রাডার ও সিগন্যালিং ব্যবস্থা সীমিত রাখা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সিভিল এভিয়েশনে।
বিমানবন্দরগুলোতে আটকে থাকা যাত্রীদের জন্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। যাত্রীদের নিয়মিত বিরতিতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের নিজস্ব অ্যাপ বা বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট অনুসরণ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফ্লাইট পুনরায় বুকিং বা বিকল্প রুটের বিষয়ে জানতে সরাসরি এয়ারলাইনের কাউন্টার বা কাস্টমার কেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জেদ্দা বা রিয়াদের মতো ব্যস্ত বিমানবন্দরে ফ্লাইট ধরতে যাত্রীদের অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগে পৌঁছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বুকিং কনফার্মেশনসহ প্রয়োজনীয় ভ্রমণসংক্রান্ত নথিপত্র সঙ্গে রাখা উচিত, যাতে বিকল্প ফ্লাইটের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ফ্লাইট বিলম্বিত হলে খাবার বা হোটেল ভাউচার পাওয়ার বিষয়ে এয়ারলাইনের নীতিমালা সম্পর্কেও সচেতন থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিনে ৫৫০টি ফ্লাইটের এই বিপর্যয় সৌদি আরবের পর্যটন ও ব্যবসায়িক খাতের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। জেদ্দা থেকে রিয়াদ কিংবা দাম্মাম থেকে মদিনা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটের যাত্রীরাই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যদি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয়, তবে এই অস্থিরতা আগামী কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন