মধ্যস্থতায় পাকিস্তান

‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ কি পারবে মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নেভাতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ কি পারবে মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নেভাতে?
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।ছবি পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেসন্সের ফেসবুক পেজ

যখন তেহরান থেকে তেল আবিব, আর বৈরুত থেকে গাজা পুরো অঞ্চলটি একটি মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সরাসরি হস্তক্ষেপে আজ সোমবার সামনে এসেছে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই প্রস্তাবটি কেবল একটি কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বাস্তবায়নে গত রবিবার রাতভর এক শ্বাসরুদ্ধকর ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ বা উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রক্ষা করেছেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান।

রোববার রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স (জিএইচকিউ) ছিল বিশ্ব রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র। সূত্রের খবর অনুযায়ী, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধারে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের মধ্যেও নমনীয়তার জায়গা খুঁজতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট) এর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন মুনির।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইসরায়েলি স্বার্থ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরান ও তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর দাবি এবং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন সেনাপ্রধানের এই পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা বিরল। এটি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা রোধে পাকিস্তান এখন বৈশ্বিক স্বার্থে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

যদিও এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে রয়টার্স ও অন্যান্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’-এর কয়েকটি সম্ভাব্য স্তম্ভ উঠে এসেছে। 

প্রথম পদক্ষেপে গাজা, লেবানন এবং ইরান-ইসরায়েল সীমান্তে অবিলম্বে সকল প্রকার সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা। বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

আটকে পড়া সাধারণ মানুষ এবং জিম্মিদের মুক্তির একটি রূপরেখা তৈরি করা। ভবিষ্যতে কোনো পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালাবে না এমন একটি গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা প্রদান।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কাতার বা ওমানের মতো প্রথাগত মধ্যস্থতাকারীদের ভিড়ে পাকিস্তান কেন? এর পেছনে কয়েকটি কৌশলগত কারণ রয়েছে। 

পাকিস্তান ও চীন বর্তমানে এক অনন্য কৌশলগত জোটে রয়েছে। বেইজিং হরমুজ প্রণালি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তারই প্রতিফলন ঘটছে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপে।

ইরানের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সামরিক সুসম্পর্ক রয়েছে, যা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও মার্কিন পেন্টাগন ও সামরিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক দশকের বেশি পুরনো পেশাদার সম্পর্ক রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে ‘পুরো উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিচ্ছেন, তখন তাঁরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আসিম মুনিরের যোগাযোগ একটি অত্যন্ত কৌশলী চাল। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘America First’ নীতির মূল কথা হলো যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখা। পাকিস্তান হয়তো ওয়াশিংটনকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে, একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের পরিপন্থী।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই মুহূর্তে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দাপ্রধান মজিদ খাদেমিকে হত্যার পর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছেন। ইসরায়েল কি পাকিস্তানের এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে? নাকি তারা ইরানকে আরও কোণঠাসা করার নীতি বজায় রাখবে এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’-এর খবরের রেশ ধরে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি ব্যারেল তেল বর্তমানে ১১১.৪৩ ডলারে স্থিতিশীল থাকলেও, যদি এই চুক্তি আলোর মুখ দেখে, তবে তা ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা ৩ হাজার জাহাজের জট খুললে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন আবার সচল হবে।

মজিদ খাদেমি নিহতের ফলে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনার মাঝে ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ একটি আশীর্বাদের মতো এসেছে। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের এই রাতভর কূটনৈতিক যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ময়দানের চেয়েও অনেক সময় আলোচনার টেবিলে বেশি বীরত্ব দেখানোর সুযোগ থাকে।

তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রস্তাব আসা যতটা সহজ, তা বাস্তবায়ন করা তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার যে গভীর সংকট রয়েছে, তা কি এই ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ মেটাতে পারবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পরিণত হবে? বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যদি এই চুক্তি সফল হয়, তবে তা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং পাকিস্তানের জন্য একটি যুগান্তকারী কূটনৈতিক জয় হিসেবে সাব্যস্ত হবে।

এএন