ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বের দাপট কি তবে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে? খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক মন্তব্য এই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা পেন্টাগনের টানা অভিযানের মধ্যেই জানা গেল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ইরানের সাধারণ পদাতিক বাহিনীর কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য একটি ছোট ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ এর আঘাতে ভূপাতিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান।
এই ঘটনা কেবল একটি বিমান ধ্বংসের খবর নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে দুই মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের রুদ্ধশ্বাস এবং প্রায় 'হলিউড মুভি'র মতো নাটকীয় এক অভিযান। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের জটিল সমীকরণকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ট্রাম্পের বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই পাইলটের ভাগ্য ঝুলে যায় অনিশ্চয়তার সুতোয়। একজন পাইলটকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয় জন নিখোঁজ হয়ে যান ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। শুরু হয় সময়ের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই। একদিকে ইরানি সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল সেই মার্কিন বিমানচালককে, অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং স্পেশাল ফোর্স তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে চেষ্টা করছিল নিখোঁজ সেনার অবস্থান শনাক্ত করতে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, সেই দ্বিতীয় পাইলট গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় একটি খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠেন। প্রতিকূল পরিবেশে তিনি নিজেই নিজের ক্ষতের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন এবং প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আত্মগোপন করে থাকেন। অবশেষে একটি সংকেত পাঠানোর যন্ত্র (বিকন) সক্রিয় করতে সক্ষম হলে সিআইএ তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করে। এরপর ২০টিরও বেশি সামরিক বিমানের সমন্বয়ে এক বিশাল বহর পাঠিয়ে ইরান ভূখণ্ডের ভেতর থেকে তাকে উদ্ধার করে আনে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে, গত ছয় সপ্তাহের অভিযানে ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি প্রায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) তথ্যানুযায়ী ১৩ হাজারেরও বেশি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। ১৫০টির বেশি ইরানি জাহাজ ও ছোট নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ ড্রোন কারখানা, ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং বিমানঘাঁটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্পের উদ্বেগের জায়গাটি অন্যখানে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, প্রচলিত যুদ্ধ বা প্রথাগত সামরিক শক্তি ধ্বংস করলেও ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ’ বা গেরিলা কৌশলে ইরান এখনও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে যখন তাকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি অকপটে বলেন, আমরা হয়তো তাদের বড় বাহিনীকে হতচকিত করে দিতে পারি, কিন্তু প্রণালীটি বন্ধ করার জন্য মাত্র একজন উগ্রপন্থী বা সন্ত্রাসীই যথেষ্ট।
এর মানে দাঁড়ায়, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে আধুনিক সমরাস্ত্রে হারালেও ছোট ছোট গোষ্ঠী বা ব্যক্তি পর্যায়ের আক্রমণ যেমন কাঁধ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ফেলে দেওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই উদ্ধার অভিযান কেবল সাহসিকতার গল্প নয়, এটি বড় ধরনের রক্তক্ষয়ের সাক্ষীও। এর আগে পাওয়া তথ্যমতে, ওই পাইলট উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় মার্কিন বাহিনীর পাল্টা হামলায় ইরানের অন্তত চারজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ইরান সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের নিখোঁজ পাইলটকে ধরার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছিল, যার ফলে ওই এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি ছায়া যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এফ-১৫-এর মতো একটি অত্যাধুনিক এবং দ্রুতগতির বিমানকে সাধারণ ‘ম্যানপ্যাডস’ দিয়ে ভূপাতিত করা সহজ কাজ নয়। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের কাছে হয়তো এমন উন্নত প্রযুক্তির ক্ষুদ্র ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা মার্কিন রাডার বা অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেমকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম। এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এল যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে সশরীরে স্থলবাহিনী বা গ্রাউন্ড ট্রুপস পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী পঙ্গু হয়ে গেলেও তাদের ভূখণ্ডে লড়াই করতে যাওয়া মার্কিন সেনাদের জন্য হবে এক মরণফাঁদ। কারণ পাহাড়-পর্বত ঘেরা এই দেশে গেরিলা যোদ্ধারা কাঁধ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ওত পেতে থাকলে আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি মার্কিন জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদিকে পাইলট উদ্ধারের বীরত্বগাথা যেমন প্রশংসা পাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ‘প্রায় ধ্বংস’ করার যে দাবি এতদিন করা হয়েছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
একটি ছোট ক্ষেপণাস্ত্র যদি পেন্টাগনের অহংকার এফ-১৫ কে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে, তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ কতটুকু প্রলয়ংকরী হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে ওয়াশিংটন। আপাতত তেহরানের এই ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ হুমকি’ মোকাবিলাই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন