বিশ্বরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম উত্তেজনাকর সময় পার করছে। গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে লোহিত সাগর পর্যন্ত সংঘাতের যে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরদার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল-বুসাইদি এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে মিলিত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দুই নেতা এই ফোনালাপে অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন।
ইরান ও ওমানের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং অত্যন্ত গভীর। ওমানকে প্রায়শই মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বলা হয়, কারণ দেশটি এই অঞ্চলের বিভিন্ন জটিল সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার বিরোধ মেটাতে বা তেহরানের সাথে অন্যান্য আরব দেশগুলোর সেতুবন্ধন তৈরিতে মাস্কাট সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
মঙ্গলবার রাতের এই ফোনালাপে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানত তিনটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে গাজা ও লেবাননে চলমান সামরিক সংঘাত, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষগুলোর সাথে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা।
গত কয়েক মাস ধরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধ কেবল গাজাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা লেবানন এবং সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই সংঘাত যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে ইরান ও ওমান উভয় দেশই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আব্বাস আরাগচি তার বক্তব্যে এই সংঘাত বন্ধে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের ওপর জোর দেন।
অন্যদিকে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল-বুসাইদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ওমানের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং সংলাপের সংস্কৃতির প্রতি তার দেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ওমান মনে করে, কোনো সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন সম্ভব নয়, বরং আলোচনার টেবিলেই সব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
ওমান কেন এই আলোচনায় এত গুরুত্বপূর্ণ, এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশটির গত কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতিতে। ওমান এমন একটি দেশ যা সৌদি আরব ও ইরান, উভয় দেশের সাথেই সমান সুসম্পর্ক বজায় রাখে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছেও ওমান অত্যন্ত বিশ্বস্ত। যখনই তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, ওমানই তখন পিছনের দরজা দিয়ে দূতিয়ালি করে পরিস্থিতি শান্ত করে।
মঙ্গলবারের ফোনালাপে ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো কোনো বিশেষ বার্তা বা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন যা এই অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা হ্রাসোয়ক হতে পারে। ওমান বরাবরই পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে, কারণ এই অঞ্চলের অশান্তি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনে।
ইরানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আব্বাস আরাগচি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। প্রতিবেশী প্রথম নীতি অনুসরণ করে ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের সাথে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে চাইছে। ওমানের সাথে এই ফোনালাপ সেই কৌশলেরই একটি অংশ।
ইরান চাচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাইরের শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কমিয়ে দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে একটি কাঠামো তৈরি করতে। আরাগচি ও আল-বুসাইদির আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং পর্যটন শিল্পের প্রসারে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেন।
ইরান ও ওমানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল তাদের নিজেদের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হরমোজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সাথে যুক্ত হওয়ায় এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়া গাজায় যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ইরানের রাজনৈতিক সমর্থন এবং ওমানের কূটনৈতিক সংযোগ অত্যন্ত জরুরি। লেবানন বা লোহিত সাগরে যদি নতুন কোনো ফ্রন্ট খুলে যায়, তবে তা বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে বিধায় ইরান ও ওমানের সংলাপ এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ইরানি ও ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যকার এই ফোন আলাপটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে। ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আরাগচির এই সমন্বয় ইঙ্গিত দেয় যে, পর্দার আড়ালে হয়তো বড় ধরনের কোনো সমঝোতা বা উত্তেজনা প্রশমনের কাজ চলছে। যুদ্ধ এবং সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতি ও সংলাপই যে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, ইরান ও ওমানের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব তারই প্রমাণ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই অঞ্চলের শক্তিশালী দেশগুলো ওমানের মতো ধৈর্যশীল এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করে, তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন অসম্ভব নয়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই পথ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সামনের দিনগুলোতে তেহরান ও মাস্কাটের এই মেলবন্ধন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন